মরুভূমিতে এক স্বর্ণখনি – মালির গল্প

মালি বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত। মানুষের গড় আয়ু এবং স্বাক্ষরতার হার সেখানে বিপজ্জনকভাবে কম। গোত্রভিত্তিক কোন্দলকে কেন্দ্র করে মালির উত্তরাঞ্চলে তুয়ারেগ গোত্রের বিদ্রোহ দেশটিকে দুভাগে বিভক্ত করার ঝুঁকির মুখে ফেলেছে, যার কারণে মালি সাম্প্রতিক বিশ্ব খবরেও উঠে এসেছে। কিন্তু মালির জীবন সবসময়ই এমন নেতিবাচক বা হতাশায় পরিপূর্ণ ছিলনা। একসময় মালি ছিল একটি সফল মুসলিম রাষ্ট্রের উজ্জ্বল উদাহরণ। ছিল বিশ্ববাসীর কাছে ঈর্ষার বস্তু। সত্যিই দেশটা ছিল যেন মরূভূমিতে এক স্বর্ণের খনি।

ভূগোল
মালি হিসাবে পরিচিত অঞ্চলটি সাহারা মরুভূমির দক্ষিণ প্রান্তসীমায় অবস্থিত। তাই মালিতে দু’টি ভিন্ন ধরনের অঞ্চল রয়েছে। উত্তরাঞ্চলে রয়েছে শুষ্ক ও অনুর্বর মরুভূমি, আর এর থেকে দক্ষিণ দিকে তা ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়েছে ঘনবর্ষণ বনাঞ্চলে। এই অঞ্চলটি ‘সাহেল’ নামে পরিচিত।

মালিতে উর্বর জমির অভাব থাকলেও অন্যান্য অতি মূল্যবান সম্পদ সে অভাব পূরণ করে দিয়েছে। স্বর্ণ ও লবণের খনি শত শত বছর ধরে মালির অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করছে। মালির উত্তরাঞ্চল থেকে বাণিজ্যপথ বর্ধিত হয়ে উত্তর আফ্রিকার উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, যেখানকার ধনী ব্যবসায়ীগণ ইউরোপ ও দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ায় পাঠানোর জন্য চড়ামূল্যে স্বর্ণ ও লবণ কিনতে আগ্রহী ছিল। এই বাণিজ্যপথগুলো মাদিন্‌কা নামক পশ্চিম আফ্রিকার স্থানীয় গোত্রটিকে অবিশ্বাস্যরকম সম্পদশালী গোত্রে পরিণত করেছিল।

অতীতের মালি ও ইসলাম
এই বাণিজ্যপথগুলো দিয়ে শুধুমাত্র মালামালই কেনাবেচা হতোনা। আইডিয়া বা চিন্তার ধারাও প্রবাহিত হতো উত্তর থেকে দক্ষিণে। স্বর্ণ আর লবণের সাথে সাথে মুসলিম বণিকগণ ইসলামকেও সাথে করে নিয়ে যেতেন। ফলে ৮ম শতক থেকে ইসলাম ধীরে ধীরে পশ্চিম আফ্রিকার সাহেলে শিকড় গাড়তে শুরু করে। প্রথমদিকে পশ্চিম আফ্রিকার অমুসলিমরা ইসলামকে দমিয়ে রাখতে চেষ্টা করে, কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে অন্ততপক্ষে সাধারণ জনগণ থেকে মুসলিমদের আলাদা রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু যখন মানুষ দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করে তখন ধীরে ধীরে ইসলামী রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়ে যায়।

timbuktu

আফ্রিকার মানচিত্রে তৎকালীন বাণিজ্যপথগুলো দেখা যাচ্ছে যেগুলো দিয়ে এই অঞ্চলে ইসলামের আগমন ঘটে

 

‘মালি’ নামক এক মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন সুনদিয়াতা কেইতা নামক এক ব্যক্তি, যিনি ইতিহাসে বেশ অজ্ঞাত, তার ব্যাপারে পরিষ্কারভাবে কিছু জানা যায়না। তার জীবনের অনেক গল্প শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লোকমুখে প্রচলিত হয়ে আসছে। যার ফলে সময়ের সাথে প্রকৃত ঘটনা বিকৃত হয়ে গিয়েছে (উদাহরণস্বরূপ, একটি উপাখ্যান হচ্ছে তিনি বিস্তারিত পড়ুন

Posted in আফ্রিকার ইতিহাস, গণিত ও বিজ্ঞান | Tagged , , , , , | মন্তব্য দিন

‘মুসলিম সিসিলি’ — ইতালিতে ইসলামের উত্থান এবং পতন

ইউরোপ মহাদেশের ইসলামের ব্যাপারে কথা উঠলেই উৎসাহ ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু বারবার আল-আন্দালুস (মুসলিম স্পেন) এবং ওসমানী খিলাফতের দিকেই চলে যায়। আল-আন্দালুস এর সময়কাল ছিল ৭১১ থেকে ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত (তবে ১৪৯২-র পরে মুসলিমরা সংখ্যালঘু হিসেবে ছিল ১৬০৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত)। অন্যদিকে আনাতোলিয়া থেকে ওসমানীরা ১৪শ শতাব্দী হতে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপ শাসন করে।

তবে ইতালির দক্ষিণ উপকূলে সিসিলি দ্বীপপুঞ্জে মুসলিম শাসনামলটি মানুষের বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছে। দ্বীপটিতে ছিল এক বৃহদাকার মুসলিম জনসংখ্যার আবাস এবং এখানে মুসলিমরা ২০০ বছরেরও বেশী সময় ধরে শাসনকার্য পরিচালনা করে। এই আর্টিকেলে আমরা অনুসন্ধান করব কিভাবে সিসিলিতে আগলাবি রাজবংশের অধীনে ইসলামের উত্থান হয়, দ্বীপটিতে মুসলিম নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়, এবং সর্বশেষ ১১শ শতকে কিভাবে দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ নরম্যানদের অধীনে চলে যায়। এই আর্টিকেলের দ্বিতীয় পর্বে মুসলিম সিসিলির সামাজিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাস পর্যালোচনা করা হবে।

উত্তর আফ্রিকার আগলাবি শাসন
মুসলিমদের উত্তর আফ্রিকা বিজয়কে মুসলিম রাষ্ট্রের সাথে বাইজেন্টাইন (পূর্ব রোমান) সাম্রাজ্যের ধারাবাহিক যুদ্ধ হিসেবে দেখা যায়, যার সূচনা হয়েছিল রাসূল ﷺ এর সময়কালেই। খলিফা উমর (রাঃ) এর শাসনামলে (৬৩৪-৬৪৪ খ্রিস্টাব্দ) খিলাফতের রাজনৈতিক সীমানা বিস্তারের এক বিস্ফোরণ ঘটে বলা চলে। সে সময়েই মুসলিমরা উত্তর আফ্রিকার মিশর থেকে লিবিয়ার পূর্বাংশ পর্যন্ত জয় করে নেয়। মুসলিমদের সামরিক অভিযান কিছুটা স্থবির হয়ে পড়ে খলিফা উসমান (রাঃ) এবং আলী (রাঃ) এর সময়কালে। তবে তা পুনরায় শুরু হয় মুয়াবিয়া (রাঃ) দ্বারা ৬৬১ খ্রিস্টাব্দে উমাইয়া খিলাফত প্রতিষ্ঠার পর। ৭ম শতাব্দীর শেষভাগেই মুসা ইবন নুসাইর এর নেতৃত্বে মুসলিম সেনাবাহিনী মরক্কোতে আটলান্টিক মহাসাগরের উপকূলে পৌঁছে যায়।

aghlabid

৯ম-১০ম শতকে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের রাজনৈতিক মানচিত্র, কেন্দ্রে আগলাবি সাম্রাজ্য

উত্তর আফ্রিকাতে উমাইয়া সরকারের নিয়ন্ত্রণ ছিল খুবই দুর্বল এবং ভঙ্গুর। উপকূলবর্তী গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো উমাইয়াদের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও পল্লী অঞ্চলগুলোতে স্থানীয় অধিবাসী ‘আমাজিগ’-দের আধিপত্য ছিল। ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে আব্বাসীয় বিপ্লবের পর নতুন এক পরিবারের হাতে খিলাফত হস্তান্তর হয় এবং মুসলিম বিশ্বের জন্য নতুন রাজধানী প্রতিষ্ঠিত হয় বাগদাদে। এর ফলে উত্তর আফ্রিকার স্বায়ত্তশাসন অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় আরো বৃদ্ধি পায়।

রাজধানী বাগদাদ থেকে বহুদূরবর্তী অঞ্চল উত্তর আফ্রিকায় শাসনকার্য পরিচালনার জটিলতার কথা চিন্তা করে আব্বাসীয় সরকার ভিন্ন পদক্ষেপ নেয়। তারা ৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে কায়রাওয়ান নগরীতে (বর্তমান তিউনিশিয়ার একটি শহর) ‘ইব্রাহিম ইবন আল-আগলাব’ নামক একজন স্থানীয় গভর্নরকে একটি অর্ধ-স্বায়ত্তশাসিত রাজবংশ প্রতিষ্ঠার অনুমতি দেয় এবং তাকে শাসনকার্য পরিচালনার ভার দেয়। যদিও আগলাবিরা নামেমাত্র আব্বাসীয়দের আধিপত্য মেনে নিয়েছিল। ইতিপূর্বে উমাইয়াদের নীতি রাজনৈতিক সীমানা বৃদ্ধির দিকে থাকলেও, আব্বাসীয় যুগে এসে এর পরিবর্তন ঘটে। শুরুর দিকে আগলাবি আমিরাত নজর দেয় অভ্যন্তরীণ দলাদলি নিয়ন্ত্রণে আনার দিকে। বিশেষ করে আরব-প্রভাবিত সেনাবাহিনীর সাথে আমাজিগদের দ্বন্দ্ব ছিল একটি বড় সমস্যা।

সিসিলি বিজয়
৯ম শতকের শুরুর দিকে সৃষ্ট অচলবাস্থা কিছু ঘটনার জন্ম দেয় যার ফলে আগলাবিরা সিসিলিতে অভিযান পরিচালনা করে। প্রথমত, সিসিলি দ্বীপপুঞ্জে কিছু রাজনৈতিক সমস্যার কারণে এক বাইজেন্টাইন নৌবাহিনী কমান্ডার ‘ইউফেমিয়াস’ নিজ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসে এবং বিস্তারিত পড়ুন

Posted in নির্বাচিত | Tagged , , , , , | মন্তব্য দিন

আব্বাসীয় বিপ্লব

হযরত আবু বকর (রাঃ), উমর (রাঃ), উসমান (রাঃ) এবং ‘আলী (রাঃ) এর নেতৃত্বে খোলাফায়ে রাশেদার সোনালী যুগ অতিক্রান্ত হবার পর ৬৬১ খ্রিস্টাব্দে মুসলিম বিশ্বের খিলাফতের ভার উমাইয়া পরিবারের কাছে হস্তগত হয়। প্রথম উমাইয়া খলিফা হযরত মুয়াবিয়া (রাঃ) দামেস্ক থেকে মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব দেন এবং ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে তাঁর পুত্র ইয়াযিদের কাছে শাসনভার অর্পন করে যান। এভাবে খিলাফত ব্যবস্থায় পরিবারতন্ত্রের সূচনা হয়, যা ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে ওসমানী খিলাফত বিলুপ্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। খিলাফতের এই দীর্ঘ ১২৯২ বছরজুড়ে বিভিন্ন পরিবারের মাঝে ক্ষমতার পালাবদল হয়। সর্বপ্রথম এরূপ পালাবদল ঘটে ৭৪০-এর দশকের শেষভাগে। এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে উমাইয়া পরিবারকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে আব্বাসীয় পরিবার প্রতিষ্ঠা করে মুসলিম ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্যগুলোর একটি।

উমাইয়াদের সমস্যা
উমাইয়া শাসনামলের ৮৯ বছরে মুসলিম বিশ্বে ভৌগোলিক, সামরিক এবং অর্থনৈতিক শক্তির ব্যাপক উন্নতি হয়। মুসলিম সেনাদল পূর্বে হিন্দুস্তান এবং পশ্চিমে স্পেন ও ফ্রান্স অভিমুখে অগ্রসর হয়। এধরণের বিজয়ের মাধ্যমে অর্থনীতির ব্যাপক সম্প্রসারণ হয়। ফলে উমাইয়া খিলাফত অবিশ্বাস্যরকম ধনী হয়ে উঠে এবং একটি স্থিতিশীল সাম্রাজ্যে পরিণত হতে থাকে।

umayyad750adloc

সর্বোচ্চ ব্যাপ্তিকালে উমাইয়া খিলাফতের মানচিত্র

এতো সাফল্য এবং ক্ষমতা অর্জন সত্ত্বেও উমাইয়া সমাজের গভীরে নানা সমস্যা টগবগ করে ফুটছিল। প্রথম সমস্যা হলো অনারবদের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ। মুসলিম সাম্রাজ্য উত্তর আফ্রিকা, স্পেন এবং পারস্যের দিকে অগ্রসর হতে থাকলে বিপুল সংখ্যক অনারব-অমুসলিম উমাইয়া খিলাফতের আওতাভুক্ত হয়। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের জীবনযাত্রায় কোন বিঘ্ন ঘটানো হয়নি যেহেতু ধর্মীয় স্বাধীনতা ছিল ইসলামী সরকারের মূলনীতিগুলোর একটি। ইসলামী শরীয়াহ্‌ মতে, অমুসলিমদের জিযিয়া বা poll tax (মাথাপিছু ধার্যকৃত কর) নামে পরিচিত একটি কর প্রদান করতে হয়। খিলাফতের বেশীরভাগ স্থানেই এই কর ছিল প্রাক ইসলামী যুগের বাইজেন্টাইন (রোমান) বা সাসানীয় (পারস্য) সাম্রাজ্যের করের চেয়ে কম, তাই এ নিয়ে সরকারের প্রতি কোন অসন্তোষ জনগণের মধ্যে ছিলনা।

যেহেতু মুসলিমদের জন্য যাকাত হচ্ছে একটি ফরজ ইবাদত যার মাধ্যমে সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ অভাবীদের মাঝে বিলি করতে হয়, তাই উমাইয়া খিলাফত মুসলিমদের থেকে যাকাত আদায় ব্যতীত অন্য কোন কর না নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। অন্যদিকে সদ্য উমাইয়া শাসনের নিয়ন্ত্রণে আসা অমুসলিমদের জন্য ইসলাম ধর্ম গ্রহণে পরিষ্কারভাবে কিছু আর্থিক সুবিধা ছিল। ধর্মান্তরিত হলে তারা জিযিয়া কর দেয়ার হাত থেকে মুক্ত হতো এবং এর পরিবর্তে যাকাত দিতে হতো। আর যাকাত অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জিযিয়ার চেয়ে কম। জিযিয়া অন্যায়ভাবে উচ্চ ছিল না যদিও, কিন্তু অপেক্ষাকৃত কম অংকের কর দেয়ার বিষয়টি মানুষকে স্বভাবতই ধর্মান্তরিত হবার ব্যাপারে উৎসাহিত করে। বিস্তারিত পড়ুন

Posted in Uncategorized | Tagged , , , , , , , , , , , , , , | মন্তব্য দিন

মঙ্গোল আগ্রাসন এবং বাগদাদ ধ্বংসযজ্ঞ

১৩শ শতাব্দীর সূচনা মুসলিমদের জন্য শুভই মনে হচ্ছিল। ১২শ শতাব্দীর শেষদিকে ক্রুসেডারদের পরাজিত করে ১১৮৭ খ্রিস্টাব্দে জেরুজালেম স্বাধীন করা, শতাব্দীর মাঝামাঝিতে মুসলিম বিশ্বকে বারবার বিভিন্নভাবে উত্যক্ত ও হয়রানী করা শিয়া ইসমাইলি ফাতিমিদদেরকে নিঃশেষ করে দেয়া, এবং পারস্যে শক্তিশালী খাওয়ারাজমীয় সাম্রাজ্যের উত্থান। সে যাহোক, এসবকিছুই ওলটপালট হয়ে যায় যখন নির্দয়-নিষ্ঠুর-পাষাণ মঙ্গোলরা দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ায় আগমন করে। যাত্রাপথে তারা যে ধ্বংসযজ্ঞ ও লুণ্ঠন চালিয়ে যায় সে ভয়াল দৃষ্টান্ত ইতিহাসে আর কোথাও পাওয়া যায়না।

মঙ্গোল কারা ছিল?
মঙ্গোলরা ছিল মধ্য এবং উত্তর এশিয়ার এক যাযাবর গোষ্ঠী। তারা এই অঞ্চলের ধূ ধূ বৃক্ষহীন প্রান্তরে বসবাস করতো। প্রতিনিয়ত স্থান পরিবর্তন আর যাযাবরবৃত্তিই ছিল তাদের জীবনধারণের একমাত্র শৈলী। সকল কাজেই তারা সবসময় ঘোড়ার উপর নির্ভরশীল ছিল, ঘোড়াই ছিল তাদের যোগাযোগের মূল মাধ্যম। তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ছিল বস্তুকেন্দ্রিক বহু ঈশ্বরবাদ। সুবৃহৎ ও সুপ্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্য এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থা তারা কখনোই গড়তে পারেনি, বরং উত্তর চীনের বিভিন্ন গোত্রের মাঝে নামেমাত্র সন্ধিচুক্তি ও জোট স্থাপনের মাধ্যমেই জীবন ধারণ করে গিয়েছে।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, মঙ্গোলরা সবসময়ই তাদের প্রতিবেশীদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত থাকতো। তাদের দক্ষিণে বসবাসরত চীনারা মূলত মঙ্গোল ও অন্যান্য আক্রমণকারীদের থেকে নিজেদের গ্রামবাসীদের রক্ষার্থেই চৈনিক সম্রাট শি হুয়াং (২৪৭-২২১ খ্রিস্টপূর্ব) এর আমলে ‘দ্যা গ্রেট ওয়াল’ নির্মাণ করে। শুধু তাই নয়, মঙ্গোলরা মধ্য এশিয়ার অন্যান্য গোত্র যেমন তুর্কি এবং তাতারদের সাথে নিয়মিত দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষে লিপ্ত ছিল।

চেংগিস খান
মঙ্গোল ইতিহাস (এবং সাথে বিশ্বের ইতিহাসও) চিরদিনের জন্য বদলে যায় চেঙ্গিস খানের শাসনামলে। চেঙ্গিস খান ছিল ১২০৬ থেকে ১২২৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মঙ্গোলদের একজন গোত্রীয় প্রধান। তার শাসনকালে সে বহু মঙ্গোল গোত্রকে অন্যান্য তুর্কি গোত্রের সাথে ঐক্যবদ্ধ করতে সমর্থ হয়। এর মাধ্যমে সে এক সুবৃহৎ ও ঐক্যবদ্ধ দল গড়ে তোলে এবং শুরু করে এমন এক জয়যাত্রা যা জয় করে নিয়েছিল ততদূর পর্যন্ত ভূখণ্ড যতদূর পথ মঙ্গোল ঘোড়সওয়াররা পাড়ি দিতে পারে।

চেঙ্গিস খান ১২১০-এর দশকে উত্তর চীনের বেশীরভাগ অংশ দখল করে নেয়। এর মাধ্যমে সে জিয়া এবং জিন সাম্রাজ্য ধ্বংস করে, সাথে বেইজিংও দখল করে নেয়। মধ্য এশিয়ার বেশীরভাগ তুর্কি গোত্রগুলোও সে দখল করতে সমর্থ হয় এবং এভাবেই পারস্য পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এর মাধ্যমে সে পূর্ব ইউরোপেও সৈন্যবাহিনী পাঠায়। রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল এবং এমনকি মধ্য ইউরোপের জার্মান প্রদেশগুলোতেও আক্রমণ চালায়।

genghis-khan

১২২০-এর দশকের মধ্যে চেঙ্গিস খানের সেনাবাহিনী লুটপাট করে ফেলে এশিয়া এবং ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চল

চেঙ্গিস খান কি কি জয় করেছিল তার চেয়েও বেশী গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে কিভাবে সে জয় করেছিল। ইচ্ছাকৃতভাবে ভীতি ও আতঙ্ক সৃষ্টিকেই সে তার মূল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতো। মঙ্গোলরা কোন শহর অবরোধ করার পর শহরবাসী কোন লড়াই না করে আত্মসমর্পণ করলে তাদের ছেড়ে দেয়া হতো, তবে তারা চলে যেত মঙ্গোল শাসনাধীনে। কিন্তু শহরবাসী আত্মসমর্পণ না করে মঙ্গোলদের সাথে লড়াই শুরু করলে বেসামরিক লোকজনসহ সকলকেই মঙ্গোলরা হত্যা করতো। চেঙ্গিস খানের এতো সফল বিজেতা হওয়ার পেছনে এ ধরনের ভয়ানক আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারার যোগ্যতার ভূমিকা ছিল অনেক অনেক বেশী। মানুষ তার হাতে গণহত্যার শিকার হবার চেয়ে আত্মসমর্পণ করাকেই শ্রেয় মনে করতো। তার গণহত্যার একটা উদাহরণ, হেরাত (বর্তমান আফগানিস্তানের একটি শহর) অবরোধ করার পর মঙ্গোলরা প্রায় ১৬,০০,০০০ (১৬ লক্ষ) মানুষ হত্যা করে।

মুসলিম বিশ্বে আক্রমণ
মুসলিমদের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে কিছু লুণ্ঠন এবং গণহত্যা চালালেও চেঙ্গিস খান মুসলিম অঞ্চলের খুব ভেতরে আক্রমণ করেনি। তার উত্তরাধিকারী ওগেদেই খানের সময়ও মুসলিমরা বারবার মঙ্গোলদের রোষানলে পড়া থেকে বেঁচে যায়। তবে ১২৫৫ খ্রিস্টাব্দে এই শান্তির অবসান ঘটে। বিখ্যাত মংকে খান, তার ভাই হুলাকু খানের উপর এক সেনাবাহিনীর দায়িত্ব অর্পণ করে যাদের লক্ষ্য ছিল বিস্তারিত পড়ুন

Posted in মঙ্গোল | Tagged , , , , , , , , | 2 টি মন্তব্য

ইমাম গাজ্জালী এবং জ্ঞানভিত্তিক ইসলামী শিক্ষার পুনর্জাগরণ

মহানবী ﷺ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, প্রত্যেক শতাব্দীতে ইসলামের সংস্কারের জন্য একজন মুজাদ্দিদ (সংস্কারক) আসবেন। ইতিহাসের পথচলায় বহু মহান মুসলিম চিন্তাবিদ, শাসক, সেনাপতি, এবং শিল্পীর জন্ম হয়েছে যারা মুসলিম বিশ্বে ইসলামকে নতুন করে উপলব্ধিতে সহায়তা করেছেন এবং বিশ্বের সমসাময়িক নানা সমস্যা মোকাবেলায় মুসলিমদের সাহায্য করেছেন। এসকল মনীষীদের প্রতিটি অবদানই সেসময়কার প্রতিটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।

ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুজাদ্দিদ (সংস্কারক) ছিলেন একাদশ শতাব্দীর প্রখ্যাত আলেম আবু হামিদ আল গাজ্জালী, যিনি আজ পরিচিত “حجة الإسلام‎” (হুজ্জাতুল ইসলাম – ইসলামের সাক্ষ্য)  নামে। সেসময়কার ইসলামের নামে প্রচলিত যেসব ভয়ংকর মতবাদ ও ভ্রান্ত দর্শন মুসলমানদেরকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল সেসবের বিরুদ্ধে কার্যকর বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের কারণে তাঁকে এই উপাধি দেয়া হয়। সর্বব্যাপী গ্রীক দর্শন থেকে শুরু করে শিয়া মতবাদের উত্থান এবং জোয়ার; সবকিছুর বিরুদ্ধেই তিনি ছিলেন সোচ্চার। ইমাম গাজ্জালী ক্ষমতাসীনদের হুমকীর মুখেও প্রকৃত ইসলামী দর্শন ও জ্ঞানের পুনরুজ্জীবনের জন্য সম্ভাব্য সকল উপায়ে চেষ্টা করেছেন।

প্রাথমিক জীবন
আবু হামিদ আল গাজ্জালী ১০৫৮ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান ইরানের তুস শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ফার্সীভাষী পরিবারের উত্তরসূরী হয়েও আরবী ভাষাতে তিনি ছিলেন সাবলীল এবং অন্যান্য মুসলিম মনীষীদের মতো আরবী ভাষাতেই লেখালেখি করেছেন। ইসলামের মৌলিক জ্ঞান ও ইসলামী আইনে তিনি অল্প বয়সেই ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। শাফেয়ী মাজহাবের প্রখ্যাত আলেম আল জুয়াইনী ছিলেন তাঁর অন্যতম শিক্ষক।

স্ব-আরোপিত নির্বাসনের সময় ইমাম আল-গাজ্জালী আল-আক্‌সা মসজিদে থাকতেন

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করার পর তিনি সেলজুক সাম্রাজ্যের অধীনে নিজামুল মুল্‌ক শাসিত ইস্পাহান প্রদেশের আদালতে যোগদান করেন। নিজামুল মুল্‌ক মুসলিম বিশ্বে আধুনিক শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত কর্মকান্ডের জন্য সুপরিচিত ছিলেন। ১০৯১ খ্রিস্টাব্দে ইমাম গাজ্জালী বাগদাদের প্রধান শিক্ষাকেন্দ্র নিজামিয়া মাদ্রাসায় যোগদান করেন। বাগদাদে তিনি অত্যন্ত সম্মানজনক অবস্থান অর্জন করেন যেখানে তাঁর নিয়মিত লেকচারগুলোতে ব্যাপক জনসমাগম ঘটতো।

সে যাহোক, ১০৯৫ খ্রিস্টাব্দে ইমাম গাজ্জালী আধ্যাত্মিকতার সংকটের বিষয়টি উপলব্ধি করেন। এ সময় তিনি নিজের শিক্ষাদানের উদ্দেশ্য নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। নিজের আত্মজীবনীতে এপ্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, “এটা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ছিলনা বরং ব্যাপক মর্যাদা ও সুখ্যাতি লাভের প্ররোচনা ও প্রেষণাই (motivation) ছিল এর পেছনের উদ্দেশ্য”। নিজের মাঝে আধ্যাত্মিকতার এই সঙ্কটের কথা বুঝতে পেরে তিনি নিজামিয়া থেকে পদত্যাগ করেন এবং দামেস্ক, জেরুজালেম এবং হেজাজ সফরে বেরিয়ে পড়েন। এই দীর্ঘ ভ্রমণকালে তিনি আত্মশুদ্ধির প্রতি গভীরভাবে মনোনিবেশ করেন এবং প্রচলিত ইসলামী ধ্যান-ধারণার নানান দিকগুলো বিশ্লেষণ করতে থাকেন।

অবশেষে ১১০৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি বিস্তারিত পড়ুন

Posted in ইসলাম শিক্ষা ও গবেষণা, গণিত ও বিজ্ঞান, দর্শন, নির্বাচিত | Tagged , , , , , , , , , , , , , , , , | 3 টি মন্তব্য

ক্রুসেডঃ পর্ব ৩ – “স্বাধীনতা অর্জন”

এই সিরিজের ১ম পর্ব এবং ২য় পর্বে আমরা ইউরোপের খ্রিস্টান ক্রুসেডারদের দ্বারা মুসলিম ভূমি আক্রমণ এবং এর কি কি প্রভাব মুসলিম বিশ্বে পড়েছিল সে ব্যাপারে পর্যালোচনা করেছি। সিরিজের এই পর্ব ইসলামের ৩য় পবিত্রতম ভূমির স্বাধীনতা এবং খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করা নিয়ে পর্যালোচনা করবে।

ক্রুসেডারদের আক্রমণের মুখে মুসলিমদের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া বস্তুত বড়ই হতাশাজনক ছিল। বাগদাদের অযোগ্য এবং অকার্যকর খলিফা মুসলিমদেরকে তাদের পবিত্র স্থানসমূহ সুরক্ষায় চেতনা জাগিয়ে তোলার ব্যাপারে একটুও মাথা ঘামাননি। অন্যদিকে সেলজুক আমিররা নিজেদের মধ্যেই হানাহানিতে ব্যস্ত ছিল। আর মিশরের ফাতেমীদ শিয়া সাম্রাজ্য প্রায়শই ক্রুসেডারদের সাথে হাত মিলিয়ে সুন্নি সেলজুকদের ক্ষতিসাধনেই লিপ্ত ছিল। আক্রমণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মতো কোন অবস্থাই মুসলিমদের ছিলনা। তবে ধীরে ধীরে মুসলিমরা ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে এবং ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়াতে আরম্ভ করে।

প্রথম যে আমির সত্যিকার অর্থেই ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন এবং সফলও হয়েছিলেন, তিনি হলেন ইমাদ আল-দ্বীন জেন্‌গি। তিনি আলেপ্পো (বর্তমান সিরিয়া) এবং মসুল (বর্তমান ইরাক) এর আমির ছিলেন। যদিও অনেক দিক দিয়েই যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত অন্যান্য তুর্কি আমিরদের সাথে তার মিল ছিল, তবুও বহু দিন পর মুসলিম বিশ্ব এমন এক নেতার সন্ধান পেয়েছিল যার মাঝে একজন প্রকৃত মুসলিম নেতার প্রয়োজনীয় অনেক বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী বিদ্যমান ছিল। তাঁর শাসনাধীন অঞ্চলের অনেক প্রাসাদে বসবাস করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি অত্যন্ত সহজ-সরল জীবন বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর জীবনযাত্রা ছিল তাঁর কর্তৃত্বাধীন সৈন্যদের মতোই সাধারণ। তিনি এসব ব্যাপারে এতোটাই কঠোর আত্মসংযমী ছিলেন যে বিখ্যাত মুসলিম ইতিহাসবিদ ইব্‌ন আসীর তাঁকে “মুসলিমদের জন্য এক ঐশ্বরিক উপহার” হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।

ইমাদ আল-দ্বীন তাঁর সুশৃংখল ও প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী নিয়ে মুসলিম ভূমিগুলো পুনর্দখল শুরু করেন। ১১৪৪ খ্রিস্টাব্দে এদেসা দখলের মাধ্যমে এই পুনর্দখলের সূচনা হয়। দখলের প্রথম দিকে ক্রুসেডাররা সিরিয়ায় অবস্থিত এই শহরটিকে প্রাথমিক আক্রমণের জন্য মূলঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছিল। ইসলামের তৃতীয় পবিত্র ভূমি স্বাধীন করার পথচলাও শুরু হলো এই নগরী পুনর্দখলের মধ্য দিয়েই। ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ আক্রমণের বিরাট এক পরিকল্পনা ছিল ইমাদ আল-দ্বীন এর, কিন্তু ১১৪৫ খ্রিস্টাব্দে অপ্রত্যাশিতভাবে তাঁর জীবনের ইতি ঘটে। এক ফ্র্যাঙ্কিশ চাকরের গুপ্তহত্যার শিকার হন তিনি। কিন্তু মুসলিমদের ঐক্যের ব্যাপারে যে গুরত্বারোপ তিনি করেছিলেন তার ফলে তাঁর গড়া ছোট্ট সাম্রাজ্যটি তাঁর মৃত্যুর পরও ভেঙ্গে যায়নি। তাঁর ছেলে নূর আল-দ্বীন জেন্‌গি সাম্রাজ্যের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। নূর আল-দ্বীন তাঁর বাবার যুদ্ধগুলো অব্যাহত রাখেন, ক্রুসেডারদের গড়া আন্তাকিয়া রাজ্য আক্রমণ করেন, সাথে সাথে দামেস্কের আমিরের সাথে জোট বেঁধে সিরিয়ার দু’টি বড় নগরী আলেপ্পো এবং দামেস্ক ঐক্যবদ্ধ করেন।

কয়েক দশক ধরে নূর আল-দ্বীন দখলদার ক্রুসেডারদের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যান বটে কিন্তু খুব একটা অগ্রসর হতে সক্ষম হননি। এসময় যে মুসলিম নেতার হাত ধরে অবশেষে বিজয় এসেছিল তাঁর আবির্ভাব ঘটে – আর তিনি হলেন সালাহ আল-দ্বীন আল-আইয়ুবীবিস্তারিত পড়ুন

Posted in ক্রুসেড (ধর্মযুদ্ধ) | Tagged , , , , , , , | ১ টি মন্তব্য

ক্রুসেডঃ পর্ব ২ – “দখল”

এই সিরিজের প্রথম পর্বে ক্রুসেডের আক্রমণের কারণ এবং ইসলামের তৃতীয় পবিত্র স্থান জেরুজালেম দখলের ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে। ক্রুসেডের উপর এই সিরিজটি এখন ক্রুসেডারদের দ্বারা মুসলিম নগরীগুলো দখলের ঘটনা বর্ণনা করবে।

৯ই আগস্ট, শুক্রবার, ১০৯৯ খ্রিস্টাব্দ। দিনটি ছিল ২৯শে রমজান। আবু সা’দ আল-হারাউই নামক এক সম্মানিত কাজী (বিচারক) বাগদাদের প্রধান মসজিদে আচমকা প্রবেশ করে জনসম্মুখে খাবার খাওয়া শুরু করেন। প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে, সবেমাত্র তিনি দামেস্ক থেকে তিন সপ্তাহ সফর শেষে ফিরেছেন এবং জেরুজালেম হারানোর খবর নিয়ে এসেছেন। তিনি ভেবেছিলেন মুসলিমদের চেতনা জাগিয়ে তুলতে রোজার মাসে দিনের বেলায় খাদ্যগ্রহণ সকলের মনোযোগ আকর্ষণে সক্ষম হবে। জেরুজালেম হারানোর খবর শুনে বাগদাদবাসী পবিত্র নগরীর জন্য কাঁদতে আরম্ভ করে। আল-মুজতাজির নামক তরুণ খলিফার সামনে আল-হারাউই তার আর্জি পেশ করলেণ যাতে খলিফা এ ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। খলিফা ওয়াদা করেন যে তিনি একটি কমিটি গঠন করে সম্ভাব্য পাল্টা আঘাতের পথগুলো খতিয়ে দেখবেন। কিন্তু পরে সেই ওয়াদা শুধু ওয়াদা-ই থেকে যায়।

ক্রুসেডারদের বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মতো অবস্থা তখন মুসলিম বিশ্বের ছিলনা। তুর্কি আমিররা প্রায়শই নিজেদের মাঝেই যুদ্ধে লিপ্ত থাকতো, ফলে শহর এবং গ্রাম ধ্বংসাবশেষে পরিণত হচ্ছিল। খলিফার নিজেরই প্রকৃত কোন ক্ষমতা ছিলনা, তুর্কি জেনারেলদের হাতে তিনি ছিলেন নিছকই এক কলের পুতুল। ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুসলিম বিশ্বের মধ্যে যে ঐক্য ছিল তখন তা অতীতের গল্প বৈ আর কিছুই নয়।

ক্রুসেডারদের দখলের পর, তাদের চারটি নতুন রাজ্য (মানচিত্রে হলুদ, নীল, লাল এবং সাদা)

অন্যদিকে ক্রুসেডাররা ছিল শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তারা ভূমধ্যসাগর উপকূলে চারটি রাজ্য গঠন করে এবং ইউরোপে ফ্রান্স ও জার্মানী যে নীতিতে পরিচালিত হতো সেভাবেই রাজ্যগুলো পরিচালনা করতে থাকে। জেরুজালেম, আন্তাকিয়া ও বৈরুত থেকে মুসলমানদের জাতিগতভাবে নির্মূল করা হলেও বেশীরভাগ আরব (মুসলিম, খ্রিস্টান এবং অর্থোডক্স খ্রিস্টান) গ্রাম্য চাষীরা তাদের নিজ এলাকায় থেকে যায়। শুধুমাত্র জেরুজালেম রাজ্যেই ৩ লক্ষের চেয়েও বেশী আরব বসবাস করত।

এই দখলদারিত্বের এক অনন্য দিক ছিল মুসলিম সংস্কৃতির সাথে ধীরে ধীরে ক্রুসেডারদের আত্মীকরণ। ক্রুসেডপূর্ব শতাব্দীগুলোতে মুসলিম বিশ্ব বিজ্ঞান, দর্শন, প্রযুক্তি এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সৃষ্টিশীলতায় অগ্রগামী ছিল। ইউরোপ তখন ছিল অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত, ঠিক তখন মুসলিমদের জীবনযাত্রার মান এমন পর্যায়ে ছিল যা ইউরোপে কল্পনাও করা যেতনা। ক্রুসেডের সমসাময়িক আরব কাহিনীকার উসামাহ ইবন মুনকিজ তার এক রচনায় লিখেছিলেন: “ফ্র্যাঙ্কদের ব্যাপারে যারা জানতো তাদের কাছে ফ্র্যাঙ্করা ছিল পশুর ন্যায় হিংস্র, আগ্রাসী এবং যুদ্ধবাজ এক জাতি, ঠিক যেমনটা শক্তি ও আগ্রাসনের দিক দিয়ে পশুরা মানুষের চেয়ে এগিয়ে থাকে।”

ধীরে ধীরে মুসলিমদের প্রচলিত চর্চাগুলো দখলদার বাহিনীর সংস্কৃতিতে প্রবেশ করা শুরু করে। দুর্গ তৈরীর মতো ইউরোপীয় কিছু কৌশল শেখা ব্যতীত মুসলিমরা ক্রুসেডারদের কাছে তেমন কিছুই শিখেনি, অন্যদিকে ক্রুসেডাররা বরং তাদের মুসলিম প্রজাদের আচরণই নকল করা ‌আরম্ভ করে। মুসলিমদের ঔষধ, ভাষা, কৃষি, প্রযুক্তি এবং গণিত সবই বিস্তারিত পড়ুন

Posted in ক্রুসেড (ধর্মযুদ্ধ) | Tagged , , , | 6 টি মন্তব্য