একজন মুসলিম যিনি চীনের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ পরিব্রাজক ও নৌসেনাপতি — ঝেং হি

বিখ্যাত পর্যটকদের কথা চিন্তা করলে প্রথমেই আমাদের মনে ইবনে বতুতা, ইভলিয়া সেলেবি, মার্কো পোলো কিংবা ক্রিস্টোফার কলম্বাসের নাম চলে আসে। কিন্তু অনেকের কাছেই সর্বকালের সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং কৌতূহলোদ্দীপক পর্যটকের নামটি অজানা। চীনে তিনি বেশ সুপরিচিত, যদিও সেখানে তাঁকে সবসময় স্বীকৃতি দেয়া হয়না। তিনি হলেন ঝেং হি — একজন মুসলিম যিনি পরবর্তীতে চীনের সর্বশ্রেষ্ঠ নৌসেনাপতি (admiral), পরিব্রাজক এবং কুটনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেন।

জন্ম এবং শৈশব
ঝেং হি ১৩৭১ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ চীনের ইউনান অঞ্চলের এক হুই (একটি জাতিগতভাবে চীনা গোত্র যারা ইসলাম ধর্মের অনুসারী) পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মকালে তাঁর নাম দেয়া হয় “মা হে”। চীনে পারিবারিক নাম আগে বলা হয় এবং পরে ডাকনাম বলা হয়। চীনে “মা” হচ্ছে “মুহাম্মাদ” এর সংক্ষিপ্ত রূপ যা মূলত ঝেং হি’র পরিবারের মুসলিম পরিচয় ও ঐতিহ্যের নির্দেশক। তাঁর বাবা ও দাদা উভয়ই মক্কায় সফর করে হজ্জ পালন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এথেকে বোঝা যায় ঝেং হি এর জন্ম হয়েছিল এক ধর্মপ্রাণ মুসলিম পরিবারে।

ঝেং এর শৈশবকালে মিং সাম্রাজ্যের সৈন্যবাহিনী তাঁর শহর আক্রমণ করে। তাঁকে বন্দী করা হয় এবং রাজধানী নানজিং এ নিয়ে যাওয়া হয় যেখানে তিনি রাজপ্রাসাদে চাকর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নানা অত্যাচার ও কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে তাঁর জীবন অতিবাহিত হলেও যুবরাজ “ঝু ডি” এর সাথে তাঁর বন্ধুত্ব হয়ে যায়। আর পরবর্তীতে সেই যুবরাজ যখন সম্রাট হন, তিনি ঝেং হি কে সরকারী উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেন। এসময়েই তাকে সম্মানসূচক “ঝেং” পদবী দেয়া হয় এবং তিনি “ঝেং হি” হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেন।

নৌ অভিযানসমূহ
১৪০৫ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট “ঝু ডি” যখন বাকি দুনিয়া আবিষ্কার এবং বিভিন্ন অঞ্চলের সাথে বাণিজ্যসম্পর্ক স্থাপনের জন্য সুবিশাল জাহাজের বহর পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন, তিনি ঝেং হি কে এই অভিযানে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য মনোনীত করেন। অভিযানটি ছিল বিশাল। ঝেং হি এর নেতৃত্বে প্রত্যেকটা অভিযানে প্রায় ৩০,০০০ জন নাবিক অংশগ্রহণ করে। ১৪০৫ থেকে ১৪৩৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ঝেং মোট ৭ টি অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানগুলোয় তিনি হিন্দুস্তান, আধুনিক মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, শ্রীলংকা, ইরান, ওমান, ইয়েমেন, সৌদী আরব, সোমালিয়া, কেনিয়াসহ আরো অনেক দেশে নোঙ্গর ফেলেন। সম্ভবত এর মধ্যে কোন একটি সফরে ঝেং মক্কা ভ্রমণ করতে ও হজ্জ সম্পন্ন করতে সক্ষম হন।

zheng-he-7th-expedition-map

মানচিত্রে ১৫শ শতকে বিশ্বের বিভিন্ন মহাদেশে ঝেং হি’র ৭ টি অভিযানের যাত্রাপথ

এই অভিযানগুলোতে ঝেং হি একমাত্র মুসলিম ছিলেননা। তাঁর উপদেষ্টাদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন চীনা মুসলিম, যেমন “মা হুয়ান” নামক একজন অনুবাদক যিনি আরবী ভাষা জানতেন এবং তাদের অভিযানগুলোতে মুসলিম মানুষদের সাথে দেখা হলে তাদের সাথে কথাবার্তা বলতে পারতেন। তিনি একটি ভ্রমণকাহিনী লিখেছেন যার নাম “য়িং-য়াই শেং-ইয়ান”। যেটি ১৫শ শতকে ভারত মহাসাগরের চারদিকে বিভিন্ন সমাজের ব্যাপারে জানার জন্য একটি গুরত্বপূর্ণ বই।

যারা তাদের জীবদ্দশায় এই অভিযানগুলো দেখেছিল তাদের জন্য এগুলো নিশ্চয়ই শীঘ্রই ভুলে যাবার মতো ছিলনা। ঝেং হি যে জাহাজটির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সেটি ছিল ৪০০ ফিট লম্বা, কলম্বাসের আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেয়া জাহাজের চেয়েও অনেকগুণ বড়। কয়েকশ বছর ধরে মানুষ ভেবে এসেছিল এত বড় জাহাজের কথাটি অতিরঞ্জিত। কিন্তু প্রত্নতাত্বিকগণ ইয়াংযে নদীর তীরে জাহাজ নির্মাণকেন্দ্র থেকে যে প্রমাণাদি সংগ্রহ করেছেন সেগুলো নিশ্চিত করে যে সেই জাহাজগুলো আধুনিক ফুটবল মাঠের চেয়েও বড় ছিল।

তারা যেখানেই গিয়েছেন, স্থানীয় মানুষদের থেকে তাদের জন্য শ্রদ্ধাবোধ (আবার কখনো কখনো সমীহ) আদায় করতে সক্ষম হয়েছিলেন। লোকজন চীনা সম্রাটের জন্য নানা উপঢৌকন দিত। এ সমস্ত উপঢৌকন এবং বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন মানুষদের সাথে স্থাপন করা বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণে ঝেং যখনই চীনে ফিরতেন, সাথে করে নানা পণ্য যেমন হাতির দাঁত দিয়ে তৈরী বিভিন্ন মূল্যবান দ্রব্যাদি, উট, স্বর্ণ এবং এমনকি আফ্রিকা থেকে জিরাফ পর্যন্ত নিয়ে যেতেন। এই অভিযানগুলো বিশ্বজুড়ে একটা বার্তাই দিচ্ছিল আর তা হচ্ছে — চীন একটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরাশক্তি।

ইসলাম প্রচার ও প্রসার
ঝেং হি পরিচালিত জাহাজগুলো শুধুমাত্র রাজনীতি বা অর্থনীতিকেই প্রভাবিত করেনি। তিনি এবং তাঁর মুসলিম উপদেষ্টারা যেখানেই গিয়েছেন সেখানেই ইসলাম প্রচার করেছেন। ইন্দোনেশিয়ার জাভা, সুমাত্রা, বোর্নিও ও অন্যান্য দ্বীপে ঝেং হি ছোট ছোট মুসলিম সম্প্রদায়ের দেখা পান। আরব ও হিন্দুস্তানের সাথে বাণিজ্যের সুবাদে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে আরো কয়েকশ বছর আগে থেকেই ইসলাম বিস্তৃতি লাভ করেছিল। ইসলাম বিস্তৃতির সেই ধারাকে অব্যাহত রাখতে ঝেং হির অবদান অসামান্য।

ঝেং হি চীনা মুসলিম সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা করেন পালেমবাং, জাভার উপকূল ঘেষে মালয় উপদ্বীপে এবং ফিলিপাইনে। এই সম্প্রদায়গুলো স্থানীয় জনসাধারণের কাছে ইসলাম প্রচার করতো এবং সেসব এলাকায় ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে তারা গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ঝেং হি’র নৌবহরের পক্ষ থেকে স্থানীয় মুসলিমদের জন্য মসজিদ নির্মাণ করে দেয়া হয় এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামাজিক সেবার ব্যবস্থা করা হয়।

zheng_he27s_ship_compared_to_columbus27s

দুবাইয়ে এক প্রদর্শনীতে ঝেং হি’র জাহাজের আকারের সাথে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের জাহাজের আকারের তুলনা

১৪৩৩ খ্রিস্টাব্দে ঝেং হি’র মৃত্যুর পর অন্যান্য চীনা মুসলিমরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তাঁর ইসলামের প্রচারের কাজ অব্যাহত রাখেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার চীনা মুসলিম বণিকদেরকে উৎসাহিত করা হতো এই অঞ্চলের বিভিন্ন দ্বীপ ও মালয় উপদ্বীপের স্থানীয় জনগণের সাথে মিলেমিশে সামাজিকভাবে বসবাস করতে ও তাদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করতে। এর ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আরো বেশী মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আসতে থাকে এবং একইসাথে দিন দিন বড় হতে থাকা এই অঞ্চলের মুসলিম সম্প্রদায়গুলো শক্তিশালী ও বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠে।

সাফল্যধারা (Legacy)
একজন নৌসেনাপতি, কূটনীতিবিদ, সৈন্য এবং বণিক হিসেবে ঝেং হি চীনা ও মুসলিম ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় চরিত্র। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইসলাম বিস্তারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী ভূমিকা রাখা ব্যক্তিদের মধ্যে তিনি একজন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তাঁর মৃত্যুর পর চীনা সরকার কনফুসীয় দর্শনের দিকে ঝুঁকে পড়ে যা ঝেং হি’র অভিযানের মতো কর্মকাণ্ডের সমর্থন করতোনা। যার ফলে তাঁর অর্জন ও অবদান কয়েকশ বছর ধরে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই ভুলে যাওয়া হয়েছে বা উপেক্ষা করা হয়েছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে অবশ্য ব্যাপারটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই অঞ্চলে ইসলামের প্রচার ও প্রসার নানা রূপে হয়েছে যেমন – বাণিজ্য, ভ্রমণ করা ধর্ম্প্রচারকদের দাওয়াত এবং অভিবাসন। এসকল কাজে নৌসেনাপতি ঝেং হি বিশাল ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর অবদানকে স্মরণ করে এই অঞ্চলের বহু মসজিদ তাঁর নামে নির্মিত হয়েছে। বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ায় পৃথিবীর বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠীর বসবাস এবং এর পেছনে একটি বড় অবদান অবশ্যই এই অঞ্চলে ঝেং হি কে দেয়া যায়।

অনুবাদ করা হয়েছেঃ The Muslim Who Was China’s Greatest Explorer – Zheng He আর্টিকেল থেকে।
অনুবাদকঃ জাহ্‌রা বিনতে মুহাম্মাদ

Source – উৎসঃ

Aqsha, D. (2010, July 13). Zheng he and islam in southeast asia. The Brunei Times. Retrieved from http://www.bt.com.bn/art-culture/2010/07/13/zheng-he-and-islam-southeast-asia

Ignatius, A. (2001, August 20). The asian voyage: In the wake of the admiral read more. Time Magazine, Retrieved from

Advertisements

About ইসলামের হারানো ইতিহাস

An Islamic history website in Bengali language which is basically the Bengali translation of the “Lost Islamic History” website (lostislamichistory.com) and Facebook page (fb.com/LostIslamicHistory).
This entry was posted in পূর্ব – এশিয়াতে ইসলাম and tagged , , , , , , , , , , , , , , , . Bookmark the permalink.

পোস্টটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্যঃ

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s