ইমাম আল-বুখারী এবং হাদীস বিজ্ঞান

ইসলামী বিজ্ঞানে, এই ধর্মের সকল জ্ঞানের উৎস হলো দুটিঃ কুরআন, এবং হযরত মুহাম্মাদ ﷺ এর বাণী ও কাজ – হাদীস। কুরআনকে ধরা হয় অপরিবর্তিত আল্লাহর বাণী হিসেবে যা মুহাম্মাদ ﷺ এর কাছে নাজিল হয়েছে, আর তাই কুরআনই হচ্ছে সকল ইসলামী জ্ঞানের ভিত্তি। কুরআনের পর দ্বিতীয় উৎস হচ্ছে রাসূল ﷺ আমাদের জন্য যেসব উদাহরণ রেখে গিয়েছেন সেগুলো।

কিন্তু তাঁর জীবনকাল ছিল ১৪০০ বছর আগে, আমরা যা আজ তাঁর কথা ও কাজ বলে মেনে নিচ্ছি, কিভাবে নিশ্চিত হবো সেগুলো সত্য ও অপরিবর্তিত রয়েছে? হাদীস বিজ্ঞান সম্পর্কে যার কোন ধারণা নেই, তার কাছে হাদীস সংগ্রহের প্রক্রিয়াটি অনির্ভরযোগ্য বলে মনে হতে পারে, সন্দেহের উদ্রেক করতে পারে। কিন্তু, ৯ম শতাব্দীতে ইমাম মুহাম্মাদ আল-বুখারীর প্রচেষ্টার কারণে হাদীস বিজ্ঞান এধরনের সমস্যা এড়িয়ে চলতে সক্ষম হয়েছে নির্দিষ্ট ও চৌকষ পদ্ধতি প্রয়োগ ও হযরত মুহাম্মাদ ﷺ এর প্রতিটি কথা যাচাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। এজন্য ২১ শতকেও আমরা হযরত মুহাম্মাদ ﷺ এর প্রকৃত ও শুদ্ধ বাণীর মাধ্যমে আজও উপকৃত হতে পারছি।

আল বুখারীর প্রাথমিক জীবন
আবু আবদাল্লাহ মুহাম্মাদ ইবন ইসমাইল আল-বুখারীর জন্ম ৮০৯ বা ৮১০ খ্রিস্টাব্দে বুখারা নগরীতে, যা আজ উজবেকিস্তানের অন্তর্গত। তিনি পারসিয়ান এক পরিবারের উত্তরসুরী যারা তাঁর তিন প্রজন্ম আগে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আল-বুখারী শিশু থাকা অবস্থাতেই বাবাকে হারান, যার ফলে তাঁর মায়ের উপর তাঁর লালন-পালনের দায়িত্ব বর্তায়। কঠিন পরিস্থিতি সত্ত্বেও, অল্প বয়স থেকেই আল-বুখারী ইসলাম বিজ্ঞান শিক্ষায় নিজেকে নিয়োজিত করেন।

ছবিতে বুখারা নগরী। এখানেই ইমাম আল-বুখারীর জন্ম এবং বেড়ে উঠা।

তাঁর নিজ শহরের বাইরের ও ভেতরের আলেমদের সাথে কাজ করতে করতে, আল-বুখারী হাদীস বিজ্ঞান ও ফিকহ বা ইসলামী আইন শাস্ত্রে শিক্ষায় মগ্ন হয়ে যান। অল্প বয়স থেকেই তাঁর মধ্যে জটিল আইন কানুন বুঝার ক্ষমতা পরিলক্ষিত হয়, তার চেয়েও বড় কথা তিনি হাদীস বর্ণনাকারীদের দীর্ঘ ও জটিল ক্রমধারা মনে রাখতে পারতেন। একটি হাদীস সহীহ বা শুদ্ধ হতে হলে এর বর্ণনাকারীদের ক্রমধারা নির্ভরযোগ্য হওয়া প্রয়োজন যেন হযরত মুহাম্মাদ ﷺ এর বাণীর সাথে সুত্র তৈরী করা যায়, এই ব্যাপারে আল-বুখারী পারদর্শী হয়ে উঠেন।

কৈশোরের শেষ দিকে তিনি বুখারাতে তাঁর পড়ালেখা শেষ করেন এবং মা ও ভাইয়ের সাথে হজ্জ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। ৭ম শতাব্দীতে ইসলামের উত্থানের পর থেকে মক্কা বিশ্বের ভ্রমণকারীদের এক অনন্য মিলনমেলায় পরিণত হয়। যেহেতু সকল মুসলিমদের জন্য অন্তত একবার হজ্জ পালন ফরজ, মক্কায় সবসময়ই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোকজন আসতো। হাদীসের আলেম হিসেবে আল-বুখারীর জন্য এমন জায়গা ও পরিবেশ অনেক বেশী গুরত্বপূর্ণ ছিল।

তিনি মক্কা ও মদীনায় বেশ কয়েক বছর অবস্থান করেন, এ সময় তিনি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় হাদীসের আলেমদের থেকে হাদীসের শব্দগুলো মুখস্ত করেন (মাতন), বর্ণনাকারীদের ক্রমধারা (ইসনাদ) এবং সেসকল বর্ণনাকারীদের নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে শিক্ষা লাভ করেন (মানুষের জ্ঞান – ‘ইলম আল-রিজাল)। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর গোটা সময়টিই তিনি মিশর, সিরিয়া ও ইরাক সফর করেন ও তাঁর জ্ঞানার্জন জারি রাখেন। শেষ পর্যন্ত বসরা নগরীতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন যেখানে তিনি হাদীস সংকলনের বিশাল কাজটি সম্পূর্ণ করেন।

সহীহ আল-বুখারী
হাদীস বিজ্ঞানের উপর ইমাম বুখারীর অনেকগুলো লেখা এবং বই রয়েছে। তবে ইসলামী বিজ্ঞানে তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান হচ্ছে তাঁর ৭০০০ এর বেশী হাদীস সংকলন। এই সংকলনটিকে তিনি “আল-জামী’ আল-সহীহ আল-মুসনাদ আল-মুখতাসার মিন উমুর রাসুল আল্লাহ ওয়া সুনানিহি ওয়া আইয়ামিহি” নাম দেন, এবং যার অর্থ হলো “(বর্ণনাকারীদের) ক্রম সহকারে সহীহ হাদীসের সংকলন যার সাথে হযরত মুহাম্মাদ ﷺ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়াদি, তাঁর কাজ ও তাঁর সময়ের যোগসুত্র রয়েছে”। এই সংকলন সম্পূর্ণ করতে ১৬ বছর সময় লাগে এবং এই সংকলন শেষ হওয়ার পর এটিকে ইতিহাসের সবচেয়ে শুদ্ধ হাদীসের বই বলে বিবেচনা করা হয়। এখানে থেকেই বইটির বহুল প্রচলিত “সহীহ-আল-বুখারী” বা “আল-বুখারীর শুদ্ধ হাদীস” নামটি আসে।

যে ব্যাপারটি সহীহ আল-বুখারীকে অন্যান্য হাদীস গ্রন্থের তুলনায় উচ্চস্তরে নিয়ে গিয়েছে সেটি হচ্ছে হাদীস সংগ্রহ ও সংকলনের ক্ষেত্রে প্রত্যেক হাদীসের বিস্তারিত খুঁটিনাটি তথ্যসমূহে ইমাম আল-বুখারীর অধিক মাত্রায় সতর্কতা। অন্যান্য আলেমদের তুলনায় তাঁর নিজের হাদীস বাছাই প্রক্রিয়া অনেক কঠোর ছিল। প্রত্যেকটি হাদীসের বর্ণনাকারীদের ক্রমধারা বিশুদ্ধ এবং নির্ভরযোগ্য হিসেবে নিশ্চিত হওয়ার পরই কেবল তিনি হাদীসটি তাঁর সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করতেন। যেমন, এই বইয়ের প্রথম হাদীসটি হচ্ছেঃ

“আমরা আল হুমাইজি আবদাল্লাহ ইবন আল-যুবায়ের থেকে শুনেছি যিনি বলেছেন তিনি সুফইয়ান থেকে শুনেছেন যিনি বলেছেন তিনি ইয়াহিয়া ইবন সা’ইদ আল-আনসারী থেকে শুনেছেন, যিনি অবহিত হয়েছিলেন মুহাম্মাদ ইবন ইবরাহিম আল-তাইমি থেকে যে তিনি শুনেছেন ‘আলকামা ইবন ওয়াক্কাস আল-লায়থি বলেন যে তিনি শুনেছেন উমর ইবন আল-খাত্তাব এক খুতবাতে বলেন তিনি রাসুল ﷺ কে বলতে শুনেছেনঃ কাজ নিয়তের দ্বারা পরিচালিত…”

এখানে ছয় বর্ণনাকারীর ধারাবাহিকতা বা ক্রম ইমাম বুখারী বিষদভাবে পরীক্ষা করে দেখেছেন। হাদীসটিকে শুদ্ধ বা সহীহ হিসেবে গ্রহণ করার আগে, ক্রমানুসারে বর্ণিত সকল মানুষের জীবন তাঁকে পর্যালোচনা করতে হয়েছে। তিনি যাচাই করে দেখেছেন হাদীস বর্ণনাকারীগণ কখন কোথায় বসবাস করতেন। কোন ব্যক্তি যদি আরেক ব্যক্তির থেকে শুনে কোন হাদীস বর্ণনা করেন, তাহলে তাঁরা দু’জনই একই সময়ে একই জায়গায় ছিলেন ও পরষ্পর সাক্ষাৎ করে হাদীস নিয়ে আলোচনা করেছেন ব্যাপারটি নিশ্চিত করা যায়। অন্যান্য হাদীসের আলেমগণের জন্য এতো প্রমাণের দরকার পড়তো না যে পর পর দুজন হাদীস বর্ণনাকারীর সামনাসামনি দেখা হওয়াটা জরুরী হবে, কিন্তু ইমাম বুখারীর কঠিন নিয়মাবলীই তার সংকলনকে অনন্য একটি সংকলনে পরিণত করেছে।

ইমাম বুখারী বর্ণনাকারীদের জীবনীও গবেষণা করেছেন যেন নিশ্চিত করতে পারেন যে বর্ণনাকারীগণ বিশ্বস্ত ছিলেন, তাদের মিথ্যা বলার সম্ভাবনা নেই কিংবা হাদীসের শব্দ পরিবর্তন করবেন এমন ব্যক্তি তাঁরা নন। বর্ণনাকারীদের তালিকায় যদি এমন কাউকে পেতেন যে প্রকাশ্যে কোন গুনাহ করেছে কিংবা যাকে বিশ্বস্ত বিবেচনা করা যায়না, সেই হাদীস সাথে সাথে বাতিল করে দিতেন, এবং হাদীসটি সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করতেননা যদি না অন্য শক্তিশালী কোন ধারাক্রম পাওয়া যেত।

হাদীসের গ্রহণযোগ্যতা নিরূপনের জন্য কঠোর নির্দেশিকা ব্যবহার করে ইমাম আল-বুখারী প্রথমবারের মতো নিয়মমাফিকভাবে হাদীসের শ্রেণীবিভাগের কাজটি করেন। যে হাদীসগুলো তিনি পর্যালোচনা করেছেন, সেগুলো সহীহ (শুদ্ধ), হাসান (ভালো), মুতাওয়াতির (অনেক বর্ণনায় পুনরাবৃত্তি ঘটেছে), আহাদ (একক), যাঈফ (দুর্বল) কিংবা মাওযু (বিকৃত) এই ভাগে ভাগ করেছেন। এই প্রক্রিয়াটি পরে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠে এবং অন্যান্য হাদীসের আলেমগণও এই শ্রেণীবিভাগটি ব্যবহার শুরু করেন।

ইমাম আল-বুখারীর ফিক্‌হ
ইমাম আল-বুখারীর হাদীস সংকলন এক অবিস্মরণীয় অর্জন এবং হাদীস বিজ্ঞানে এক অতুলনীয় সংযোজন। তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে হাদীস গবেষণা বৈজ্ঞানিক রূপ লাভ করে যেখানে কোন প্রকার পরিবর্তন বা বিকৃতি ঠেকানোর জন্য নিয়মকানুন প্রয়োগের ব্যবস্থা রয়েছে। যাই হোক, এটি শুধুমাত্র হাদীসের একটি সাধারণ সংকলন নয়, আল-বুখারী তাঁর সংগ্রহকে এমনভাবে সাজিয়েছেন যেন তা ইসলামী আইন বা ফিক্‌হ বুঝতে সাহায্য করে।

সহীহ আল-বুখারীকে ৯৭টি বইয়ে বিভক্ত করা হয়েছে, যার প্রত্যেকটিতে অসংখ্য অধ্যায় রয়েছে। আইনের একেকটি ইস্যুর ভিত্তিতে একেকটি অধ্যায়ের নামকরণ করা হয়েছে। এবং সেই অধ্যায়ে সেসব হাদীস অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যেগুলোকে বিশুদ্ধ বিবেচনা করা হয় ও যেগুলোতে সেই আইনকে সমর্থন করার প্রমাণ রয়েছে। যেমন, রমজান মাসে অতিরিক্ত বা নফল নামাজ (তারাবী) সম্পর্কিত অধ্যায়টির নাম, “রমজানে অতিরিক্ত নামাজ পড়ার সুফল” এবং সেখানে হযরত মুহাম্মাদ ﷺ এর ছয়টি বাণী রয়েছে যেখানে বর্ণনা করা হয়েছে তারাবী নামাজ কতোটা গুরত্বপূর্ণ।

তাই সহীহ আল-বুখারী হাদীসের সবচেয়ে শুদ্ধতম সংকলনই নয়, বরং ইমাম আল-বুখারী তাঁর দুরদর্শিতার মাধ্যমে বইটিকে এমনভাবে লিখেছেন যেন তা মুসলিমদেরকে মুহাম্মাদ ﷺ এর জীবন যতটুকু সম্ভব অনুসরণ করতে সাহায্য করে। তাঁর কাজ অনুপ্রাণিত করে গিয়েছে এরপরের সকল প্রজন্মের হাদীস আলেমদের, বিশেষ করে তাঁর ছাত্র ‘মুসলিম ইবন আল-হাজ্জাজ’, যিনি “সহীহ মুসলিম” এর সংকলনকারী। এটি সহীহ আল-বুখারীর পর দ্বিতীয় শুদ্ধতম সংকলন হিসেবে সমাদৃত।

অমুসলিমদের ইসলামী বিজ্ঞান নিয়ে একটি পরিচিত অভিযোগ হলো হাদীসের শুদ্ধতা প্রমাণ করার কোন উপায় নেই এবং তাই সেগুলো বিশ্বাসের উৎস বা আইন হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। হাদীস সংগ্রহের প্রক্রিয়া ও এর শুদ্ধতা সমুন্নত রাখার জন্য ইমাম-বুখারীর মতো আলেমদের প্রচেষ্টাকে ভুল বুঝার কারণেই এধরনের ভুল যুক্তির আবির্ভাব ঘটেছে। হাদীস নিয়ে আল-বুখারীসহ অন্যান্য আলিমদের গবেষণা ও কাজের কারণেই আজ ১৪০০ বছর পরও আমরা হযরত মুহাম্মাদ ﷺ এর প্রকৃত কথা ও কাজ সম্পর্কে জানতে পারছি।

অনুবাদ করা হয়েছেঃ Imam al-Bukhari and the Science of Hadith আর্টিকেল থেকে।
অনুবাদকঃ জাহ্‌রা বিনতে মুহাম্মাদ

Bibliography – গ্রন্থপঞ্জিঃ

Khan, Muhammad. The Muslim 100. Leicestershire, United Kingdom: Kube Publishing Ltd, 2008. Print.

Siddiqi, Muhammad. Hadith Literature. Cambridge: The Islamic Texts Society, 1993. Print.

Advertisements

About ইসলামের হারানো ইতিহাস

An Islamic history website in Bengali language which is basically the Bengali translation of the “Lost Islamic History” website (lostislamichistory.com) and Facebook page (fb.com/LostIslamicHistory).
This entry was posted in ইসলাম শিক্ষা ও গবেষণা, নির্বাচিত and tagged , , , , , , , , , , , , . Bookmark the permalink.

3 Responses to ইমাম আল-বুখারী এবং হাদীস বিজ্ঞান

  1. Rahat বলেছেন:

    Carry on. May Allah bless you for your effort.

    Liked by 1 person

  2. ইমাম আল-বুখারীর জীবনীর উপর একটি চমৎকার ভিডিও লেকচারঃ https://www.youtube.com/watch?v=v2vmBXCsr80#t=16m13s

    Like

পোস্টটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্যঃ

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s