জাইরাবঃ সাংস্কৃতিক জগতের এক অনন্য বিপ্লবী

সংস্কৃতি বা কালচারকে ঐতিহাসিকভাবে বিশ্লেষণ করা খুবই কঠিন। বর্তমান সংস্কৃতি বা প্রচলিত চর্চাগুলোর শুরুটা ঠিক কিভাবে হয়েছিল? কোন কোন অঞ্চল ও সময় প্রভাবিত করেছিল আমাদের সংস্কৃতিকে? প্রাচীন সংস্কৃতির সাথে আমাদের এখনকার সংস্কৃতির পার্থক্যই বা কোথায়? এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য অতীতে সাংস্কৃতিক মহারথীদের নিয়ে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এমনই এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন ৯ম দশকের আন্দালুসিয়া (মুসলিম স্পেন) এর অধিবাসী একজন মুসলিম ব্যক্তি। তাকে স্নেহবশত ‘জাইরাব’ নামে ডাকা হতো। ফ্যাশন থেকে শুরু করে খাদ্যাভাস, সঙ্গীত, বিভিন্ন ধরনের চুলের স্টাইল, স্বাস্থ্যবিধি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় তিনি এক বিপ্লব সাধন করেছিলেন। তিনি ছিলেন মধ্যযুগের সংস্কৃতি ও ফ্যাশনের আইকন এবং তার কাজের ছাপ আমরা দেখতে পাই আজ এই আধুনিক বিশ্বেও।

সঙ্গীত ও তার শিকড়
জাইরাবের পিতৃপ্রদত্ত নাম ছিল আবু আল-হাসান। তিনি ৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন, তবে জন্মস্থান নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে ঐতিহাসিকগণ তাকে কখনো আরব, কখনো ফার্সি, কখনো কুর্দি কিংবা কখনো কৃষ্ণ আফ্রিকান বলে দাবী করেছেন। কোন সন্দেহ নেই, তাকে নিজেদের গোত্রের দাবী করার প্রচেষ্টাতেই এই বিতর্কের জন্ম হয়েছে। আরবীতে তার ডাকনাম জাইরাবের অর্থ হচ্ছে “ব্ল্যাকবার্ড” বা “কালো পাখি”। তামাটে গাত্রবর্ণ আর গানের সুন্দর গলার জন্যই তাকে এই ডাকনামটি দেয়া হয়।

আব্বাসীয় খিলাফতের সময় খলিফা হারুর আল-রশীদ এর শাসনামলে বাগদাদে জাইরাব মূলত রাজ-দরবারের বিনোদন শিল্পী ছিলেন। কথিত আছে, তিনি এতো ভাল গায়ক ছিলেন যে রাজ-দরবারের অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ তার উপর ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে উঠেন এবং তার এই মেধার কারণে নিজেদের চাকরি হারানোর ভয়ে তার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করে তাকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেন। নির্বাসিত হয়ে জাইরাব আফ্রিকায় আশ্রয় খুঁজতে থাকেন এবং সকল স্থানীয় শাসকদের কাছে তার মেধার বিনিময়ে চাকরি প্রার্থনা করেন। তার জীবনের সুবর্ণ সুযোগটি আসে যখন স্পেনের উমাইয়া খিলাফত শাসিত সাম্রাজ্যের উমাইয়া আমির আল-হাকাম তাকে আমন্ত্রণ জানান।

মধ্যযুগীয় Lute, যেখানে জাইরাব ৫ম তার সংযোজন করেন

জাইরাব যখন শেষ পর্যন্ত আন্দালুসে পৌঁছান, আল-হাকামের উত্তরসুরী দ্বিতীয় আব্‌দ আল-রাহমান তাকে স্বাগত জানান। আব্‌দ আল-রহমান জাইরাবের মেধায় মুগ্ধ হয়ে সাথে সাথে তাকে কর্ডোবার রাজ-দরবারের সদস্য হিসেবে নিযুক্ত করেন। তিনি জাইরাবের জন্য বেশ ভালো বেতন নির্ধারণ করে দেন, থাকার জন্য প্রাসাদের বন্দোবস্ত করে দেন এবং আন্দালুসিয়ার সাংস্কৃতিক উন্নয়নের নিয়ন্ত্রণের সিংহভাগ তার হাতে অর্পণ করে দেন।

এরপর জাইরাব মানুষকে সঙ্গীত শিল্প ও বিনোদন সম্পর্কে শিক্ষিত করে তোলার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এই প্রতিষ্ঠানে তিনি ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাইকেই ছাত্র-ছাত্রী হিসেবে নিতেন। তিনি ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীতগুলো এবং ফেলে আসা বাড়ি বাগদাদ এর গানগুলো শেখাতেন। অনেক গানেই তিনি নিজের নতুন সংযোজন করেছিলেন, সামনের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন এই সৃজনশীলতা বজায় রেখে। লুট (Lute) নামক একটি বহুল ব্যবহৃত ঐতিহ্যবাহী এক বাদ্যযন্ত্রে তিনি পঞ্চম তার সংযোজন করেন। যা পরবর্তীতে গিটার আবিষ্কারের পথ প্রসারিত করে। আল-আন্দালুসে সমাজের সকল স্তরের মানুষের কাছে তিনি শীর্ষস্থানীয় সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে সম্মানিত ছিলেন।

ফ্যাশন ও খাদ্য
বর্তমানে কোন সুপারস্টার সঙ্গীতশিল্পীর মতোই জাইরাব ফ্যাশন ও সংস্কৃতির আইকন ছিলেন। একদম লেটেস্ট এবং সেরা পোশাক-আশাক, চুলের স্টাইল ও খাবারের খোঁজ মানুষ তার থেকে নিতো। জাইরাব তাদের কখনোই হতাশ করেননি।

তার আগমণের আগ পর্যন্ত আল-আন্দালুস ছিল একটু রুক্ষ। রুচিসম্মত পোশাক-আশাক কিংবা স্টাইলের দিকে কারো অত নজর ছিলনা। জাইরাব এই ধারার পরিবর্তন করেন। বছরের বিভিন্ন সময়ের জন্য বিশেষ রংয়ের পোশাক পড়ার প্রচলন করেন তিনি। শীতের পোশাক হবে গাঢ় রংয়ের ও ভারী কাপড়ের, সাথে থাকবে পশমের ব্যবহার, যা শীতের পোশাককে করেছিল অনন্য। শরৎ কিংবা বসন্তের কাপড়ে সেই ঋতুর রং প্রাধান্য পাবে। শরতে মানুষ শরৎ ঋতুর পাতার রংয়ের সাথে মিলি রেখে লাল, হলুদ আর কমলা পোশাক পড়বে। বসন্তে পড়বে উজ্জল রংয়ের পোশাক, যা চারিদিকে ফুটন্ত ফুলের কথা মনে করিয়ে দেবে। গ্রীষ্মে সাদা কিংবা হালকা রংয়ের পোশাক পড়তে হবে। “লেবার ডে’র (সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে) পর আর কোন সাদা পোশাক নয়” নামক আধুনিক যে রীতিটি প্রচলিত তার উৎপত্তি এখান থেকেই।

জাইরাব সর্বপ্রথম শতমূলীকে খাবার হিসেবে ব্যবহার করেন

আল-আন্দালুসের খাদ্যাভ্যাসের মাঝেও তিনি ব্যাপক পরিবর্তন আনেন। এর আগে আল-আন্দালুস (কিংবা মুসলিম বিশ্বে) বিভিন্ন পদে খাবার পরিবেশন করার প্রচলন ছিলনা। মাংস থেকে শুরু করে মিস্টি কিংবা সালাদ, সকল স্বাদের ও রুচির খাবার একইসাথে পরিবেশন করা হতো। জাইরাব বললেন খাবার পরিবেশনের মাঝেও ক্রমধারার প্রচলন করা যায়। স্যুপকে প্রথমে রুচিবর্ধক হিসেবে পরিবেশন করা হবে, তার পর আসবে প্রধান পদগুলোঃ গোস্ত, মাছ কিংবা অন্যান্য ভারী খাবারসমূহ। পরিশেষে, খাওয়া শেষ করা হবে বিভিন্ন ফল ও মিস্টি দিয়ে, সাথে নাস্তা হিসেবে বাদাম পরিবেশিত হবে। এই পদ্ধতি রাধুনীর রন্ধন প্রক্রিয়া ও মানুষের খাদ্যাভাসে বিশাল পরিবর্তন নিয়ে আসে। আজ এই আধুনিক যুগেও বহুপদের খাবার একইভাবে পরিবেশন করা হয়, যা জাইরাব আরম্ভ করেছিলেন আজ থেকে এক হাজার এরও বেশী বছর আগে।

স্বাস্থ্যবিধি ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা
জাইরাবের পদচারণা কয়েকটি ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিলনা, আন্দালুসিয়াবাসীর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দেন তিনি। এই অঞ্চলে জাইরাব প্রথম টুথপেস্টের প্রচলন করেন (যারা খুব কাছাকাছি থেকে একে অন্যের সাথে কথা বলতো, তাদের জন্য নিঃসন্দেহে এটি ছিল সুসংবাদ)। আন্দালুসিয়ার গ্রীষ্মের চরম তাপদাহেও গায়ে সুগন্ধ বজায় রাখতে তিনি ডিওডোরেন্ট বা সুগন্ধি ব্যবহারের পরামর্শ দেন। তিনি নিত্যনতুন চুলের ছাট আবিষ্কার করেন। এর আগে আল-আন্দালুস এর পুরুষ ও মহিলাদের চুল থাকতো দীর্ঘ ও অবিন্যস্ত। জাইরাব কিছু চুলের ছাট জনপ্রিয় করে তোলেন যেখানে পুরুষদের চুল ছোট ও পরিষ্কার এবং মেয়েদের চুল কপালের সামনে বাকা ছাটে কাটা থাকতো (যা এখন ‘ব্যাংস’ নামে পরিচিত)। এই নতুন ছাটের চুলের চর্চার জন্য তিনি গোলাপজল ও লবণ দিয়ে তৈরী শ্যাম্পুর প্রচলন করেন, যার মাধ্যমে চুল আগের চেয়ে অনেক সুন্দর ও সতেজ থাকতো।

সাংস্কৃতিক বা কালচারাল আইকন হিসেবে ফ্যাশন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং খাদ্যাভাসের ব্যাপারে তার শুরু করা রীতিগুলো ছড়িয়ে পড়ে আইবেরিয়া উপদ্বীপ (বর্তমান স্পেন ও পর্তুগাল) এর সীমানা ছাড়িয়ে দূর-দূরান্তে। গোটা মধ্যযুগীয় ইউরোপে এবং মুসলিম বিশ্বে তার এই রীতিগুলো মানুষ অনুকরণ করতে থাকে, যুক্ত করতে থাকে তাদের কৃষ্টি ও সংস্কৃতিতে। আজ এই আধুনিক বিশ্বেও আমরা যেভাবে খাই, যেভাবে পোশাক পরিধান করি এবং নিজেদের পরিচর্যা করি তাতে তার সৃষ্টিগুলোর ছাপ পড়ে আছে। তিনি সংস্কৃতির এক সত্যিকারের প্রতিমূর্তি ছিলেন যার স্টাইল তার জীবদ্দশা পেরিয়ে বহুবছর ধরে টিকে রয়েছে।

অনুবাদ করা হয়েছেঃ The Cultural Icon of Al-Andalus আর্টিকেল থেকে।
অনুবাদকঃ জাহ্‌রা বিনতে মুহাম্মাদ

Bibliography – গ্রন্থপঞ্জিঃ

Ibn Khaldūn. The Muqaddimah, An Introduction To History. Bollingen, 1969. 230. Print.

Lebling, Robert. “Flight of the Blackbird.” Saudi Aramco World. 2004: n. page. Web. 23 Dec. 2012. <http://www.saudiaramcoworld.com/issue/200407/flight.of.the.blackbird-.compilation..htm>.

Najeebabadi, Akbar Shah. The History of Islam. 3. Riyadh: Darussalam, 2001. Print.

Advertisements

About ইসলামের হারানো ইতিহাস

An Islamic history website in Bengali language which is basically the Bengali translation of the “Lost Islamic History” website (lostislamichistory.com) and Facebook page (fb.com/LostIslamicHistory).
This entry was posted in আল-আন্দালুস (মুসলিম স্পেন). Bookmark the permalink.

পোস্টটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্যঃ

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s