আল-জাহরাভী – আধুনিক চিকিৎসার পথিকৃৎ

আমাদের ওয়েবসাইটে এটা প্রায় সময়ই উল্লেখ করা হয়েছে যে মুসলিম শাসিত স্পেন (যা আল-আন্দালুস নামে পরিচিত) এর সময়টুকু ছিল ইসলামি সভ্যতা ও সামাজিক ব্যবস্থার স্বর্ণযুগ। যে সমাজে ইসলাম, খ্রিস্টান, এবং ইহুদীধর্মের মাঝে সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। বিজ্ঞানে অভূতপূর্ব উন্নয়ন দেখা গিয়েছিল। সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা কোন “বিশেষ ব্যতিক্রম” ছিলনা, বরং ছিল একটা রীতি।

মুসলিম স্পেনের মহান ব্যক্তিত্বদের অন্যতম একজন হলেন মধ্যযুগে ইসলামের শ্রেষ্ঠ সার্জন “আবু আল-কাসিম আল-জাহরাভী”। চিকিৎসার নতুন কৌশল ও যন্ত্রপাতি আবিষ্কারের মাধ্যমে তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানে আমূল পরিবর্তন আনেন। তাঁর রচিত ৩০ খণ্ডের এনসাইক্লোপেডিয়া (জ্ঞানকোষ) শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইউরোপে মূল পাঠ্য হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসার কলা-কৌশল কেমন হবে সে ব্যাপারে তাঁর অবদান ছিল যুগান্তকারী।

জন্ম এবং পেশা
আল-জাহরাভী এর জীবনকালে উমাইয়া খিলাফত ছিল এর শক্তি ও ক্ষমতার উচ্চ শিখরে। তিনি ৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন, মৃতুবরণ করেন ১০৩০ খ্রিস্টাব্দে। জীবনকালে উমাইয়া খলিফা দ্বিতীয় আল-হাকাম ও সামরিক শাসক আল-মানসুর এর হয়ে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর গোটা জীবন জুড়েই তিনি ছিলেন রাজ-দরবারের চিকিৎসক। চিকিৎসাক্ষেত্রে তাঁর মেধার বদৌলতে তিনি আল-আন্দালুস শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতা এবং স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। এভাবেই তিনি একজন চিকিৎসক হিসেবে ৫০ বছর ধরে তাঁর দায়িত্ব পালন করেন।

আজ এই আধুনিক বিশ্বের অধিকাংশ ডাক্তার কিংবা হাসপাতালের মতো নয়, আল-জাহরাভী রোগী দেখতেন রোগীদের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা না করেই। প্রতিদিন বিভিন্ন রোগী দেখে তাদের রোগ ও চিকিৎসার বর্ণনা লিখে রাখতেন যা পরবর্তীতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অমূল্য গ্রন্থঃ “আল-তাস্‌রিফ”-রূপে প্রকাশিত হয়।

আল-তাস্‌রিফ

১০ম শতকে আল-জাহরাভী লিখিত আল-তাস্‌রিফ গ্রন্থের মূল কপির একটি পাতা

চিকিৎসাবিজ্ঞানের উপর লেখা তাঁর এনসাইক্লোপেডিয়াটি ৩০ খণ্ডে বিভক্ত। এক একটি খণ্ডে বিভিন্ন ধরনের ঔষধ এবং পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। প্রথম দিকের একটি খণ্ডে তিনি রোগ নির্ণয়ের ব্যাপারে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, একজন ভাল ডাক্তার সবসময় রোগী নিজের ব্যাপারে কি বলছে তার পরিবর্তে নিজের ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ ও রোগীর লক্ষণসমূহের উপর নির্ভর করবে – যে চর্চা আজও ডাক্তাররা করে আসছেন।

আল জাহরাভী চিকিৎসার ক্ষেত্রে এক সার্বজনীন পদক্ষেপ নেন। শুধু রোগ নিরাময় নিয়েই নয়, কিভাবে রোগ প্রতিরোধ করা উচিত তাও তিনি ব্যাখ্যা করেন। তাঁর লিখিত বইগুলোর একটি বড় অংশে তিনি আলোচনা করেন সুস্থতার জন্য কি ধরনের খাবার এড়িয়ে চলা প্রয়োজন, কিভাবে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা যায় এবং কিভাবে খাদ্যকে সুচিকিৎসার পরিকল্পনার একটি অংশ হিসাবে ব্যবহার করা যায়। মদ পানের খারাপ দিকগুলো তিনি বিশেষভাবে তুলে ধরেন। এ ব্যাপারে তিনি বলেনঃ

“মদ শরীরের বেশীরভাগ স্নায়ু দুর্বল করে দেয়, কথা বলায় সমস্যা সৃষ্টি করে, দুর্বলতার কারণে শরীরের স্বাভাবিক নড়াচড়া, হাঁটাচলায় সমস্যা সৃষ্টি হয়। তাছাড়া হাড়ের রোগ, গেটে বাত ও যকৃতে ব্যাঘাত ঘটায় যার ফলে টিউমার ও নানাবিধ অসুখ এর সৃষ্টি হয়, পেটে পানি জমে যকৃত অকৃতকার্য হয়ে পড়ে।” (১)

আল-তাস্‌রিফ এর ৩০তম খণ্ডটি হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খণ্ড যেখানে তিনি সার্জারী নিয়ে আলোচনা করেছেন। কিছু নির্দিষ্ট রোগের নিরাময়ের জন্য যে নির্দিষ্ট সার্জারীগুলো যেভাবে করতে হবে তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি জোর প্রকাশ করেন যে প্রত্যেক সার্জনকে অবশ্যই সবার আগে দক্ষ হতে হবে চিকিৎসাপদ্ধতি, দেহের গঠনের ব্যাপারে, এবং এমনকি সেসকল দার্শনিকদের লেখাও পড়তে হবে যারা চিকিৎসাবিজ্ঞানে পড়ালেখা করেছেন।

আজ এই আধুনিক যুগে অপারেশন থিয়েটারে ব্যবহৃত বেশীরভাগ চিকিৎসা পদ্ধতি এবং অপারেশনের যন্ত্রপাতির প্রবর্তক ছিলেন আল-জাহরাভী। তিনিই সর্বপ্রথম (অপারেশনের পর চামড়া জোড়া লাগাতে) সেলাইয়ের কাজে বিড়ালের নাড়িভুঁড়ি থেকে তৈরি একধরনের সুতা ব্যবহার করেন। সেলাইয়ের পর এই সুতা নিজে নিজেই শরীরের সাথে মিশে যায় যার কারণে সেলাইয়ের পর সুতো খোলার জন্য দ্বিতীয় অপারেশন করতে হয়না। তিনিই সর্বপ্রথম সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে ‘ফরসেপ’ নামক যন্ত্রের ব্যবহার করেন যা মা ও শিশু মৃত্যুহার অনেক কমিয়ে দিয়েছিল। বর্তমানে টনসিল অপসারনে ব্যবহৃত ‘টনসিলেক্‌টমী’ অপারেশন এবং এতে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি দিয়েই তিনি এই অপারেশন করতেন। অপারেশনের সময় কোন কিছু কাটার সময় তিনি এক ধরনের লুকোনো ছুড়ি ব্যবহার করতেন যাতে রোগীরা বুঝতে না পারে। রোগীদের যাতে কষ্ট কম হয় সেজন্য তিনি প্রয়োজন ও অবস্থা অনুযায়ী শরীরে এবং মুখে, উভয় স্থানে অ্যানাসথেসিয়া (অসাড়করণ) পদ্ধতি ব্যবহার করতেন। নারীদের স্তন ক্যান্সারে তিনি ‘মাসটেক্‌টমী’ পদ্ধতি ব্যবহার করতেন যেখানে স্তন অপসারণ করে ফেলা হয়, এ পদ্ধতি স্তন ক্যান্সারে আজও ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তিনি ব্যাখ্যা করেন কিভাবে ভাঙ্গা হাড় জোড়া লাগাতে হয়, প্রয়োজনে বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেটে ফেলতে হয়, এমনকি কিভাবে মূত্রাশয়ের পাথর সরাতে হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে তার করা সকল “সর্বপ্রথম আবিষ্কার” এর বর্ণনা দিতে গেলে এ বিষয়ের উপরই একটি আলাদা বই লিখতে হবে।

আল-জাহরাভী আবিষ্কৃত ইন্‌হেলার (শ্বাসকষ্টের রোগীরা যেটা নিয়মিত ব্যবহার করেন)। ছবিতে উপরের দিকে মূল আরবী এবং নিচে ল্যাটিন অনুবাদ।

তার অপরিমেয় জ্ঞান ও দক্ষতা সত্ত্বেও রোগীর জন্য শারীরিক এবং মানসিকভাবে খুবই কঠিন হবে এমন ঝুঁকিপূর্ণ ও অজানা কোন অপারেশন করতে তিনি সবসময় অস্বীকৃতি জানাতেন। তাঁর কাছে মানুষের জীবনই সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তাই সবসময় কোন জীবনকে যতদিন সম্ভব বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করতেন। রোগীদের সাথে আচরণ, শয্যাপাশে তাদের সাহস ও প্রশান্তি দেয়ার ক্ষেত্রে তাঁর নজির অন্য সকল চিকিৎসকের কাছে একটি উদাহরণ হয়ে থাকবে।

উত্তরাধিকার
তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আল-তাস্‌রিফ, আল-আন্দালুস থেকে মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে এবং পরবর্তীতে গোটা খ্রিস্টানবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক শতাব্দী ধরে ল্যাটিন এবং অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষায় এর অনুবাদ করা হয়। যার ফলে তাঁর আবিষ্কৃত অনেক পদ্ধতিরই এমন নাম দেয়া হয় যা দেখে বুঝার কোন উপায়ই নেই যে পদ্ধতিগুলো তাঁর আবিষ্কার। উদাহরণস্বরূপ, সন্তানপ্রসবে “Walcher position” এবং স্থানচ্যুত হওয়া কাঁধ ঠিক করার জন্য “Kocher method” আবিষ্কারের কৃতিত্ব পরবর্তীতে চলে যায় ইউরোপীয় চিকিৎসকদের কাছে।

তাঁর কৃতিত্ব যদি আমরা অগ্রাহ্যও করি, তৎকালীন সময়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এবং বিশেষ করে সার্জারীতে তাঁর অবদান ছিল অবিস্মরণীয়। তাঁর আবিষ্কৃত পদ্ধতি ও যন্ত্রপাতিগুলো ছাড়া আজ এই আধুনিক যুগেও হয়তো অপারেশন হতো এক বর্বর অনিশ্চয়তার খেলা। তাঁর দক্ষতা এবং নিয়মিত রেকর্ড করে রাখা বিভিন্ন পদ্ধতি আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতিতে অনেক বড় ভূমিকা রেখেছে। আমরা আজও এই মেধাবী চিকিৎসাবিজ্ঞানীর কাছে ঋণী।

অনুবাদ করা হয়েছেঃ Al-Zahrawi – The Pioneer of Modern Surgery আর্টিকেল থেকে।
অনুবাদকঃ সাদাত ইফতেখার

Footnotes:
১ – Awadain, M. Reda. “A Recent Look and Study of Some Papers of al-Zahrawi’s Book “al-Tasrif”.” IslamSet. N.p.. Web. 16 Dec 2012.

Bibliography – গ্রন্থপঞ্জিঃ
al-Hassani, Salim. 1001 Inventions: The Enduring Legacy of Muslim Civilization. Washington D.C. : National Geographic Society, 2012. Print.

Awadain, M. Reda. “A Recent Look and Study of Some Papers of al-Zahrawi’s Book “al-Tasrif”.” IslamSet. N.p.. Web. 16 Dec 2012.

Morgan, M. (2007). Lost History. Washington D.C. : National Geographic Society.

Advertisements

About ইসলামের হারানো ইতিহাস

An Islamic history website in Bengali language which is basically the Bengali translation of the “Lost Islamic History” website (lostislamichistory.com) and Facebook page (fb.com/LostIslamicHistory).
This entry was posted in আল-আন্দালুস (মুসলিম স্পেন), গণিত ও বিজ্ঞান. Bookmark the permalink.

পোস্টটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্যঃ

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s