ওসমানী সুলতানের কাছে (স্পেনের) মরিস্কোদের আবেদন

ইসলামের রাজনৈতিক ইতিহাসকে ক্ষমতা এবং দুর্বলতার মাঝে দোদুল্যমান একটি চক্রের আকারে বিবেচনা করা যায়। ৮ম থেকে ১১শ শতক পর্যন্ত গণিত ও বিজ্ঞান গবেষণায় অপরিসীম অবদান রেখে যাওয়া আব্বাসীয় খিলাফতের মর্মান্তিক ইতি ঘটে ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দে মঙ্গোলদের বাগদাদ ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে। আবার এই ধ্বংসাবশেষ থেকেই ওসমানীদের উত্থান হয় এবং এক সময় তাঁরা হয়ে উঠে ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিধর সাম্রাজ্য। তবে শেষ পর্যন্ত ১ম বিশ্বযুদ্ধের পরিসমাপ্তির সাথে সাথে বোবা কান্নার মতো ওসমানীদেরও পতন ঘটে। এমন অনেক উদাহরণ বিভিন্ন মুসলিম সমাজের ক্রম উত্থান-পতন চিত্রায়ণ করে

উত্থান ও পতনের এই চক্রের মাঝে আবার এমনও অনেক সময় গিয়েছে যখন কাকতালীয়ভাবে এক মুসলিম সমাজের পতন এবং আরেক মুসলিম সমাজের উত্থান একই সময়ে ঘটেছে। এমনই এক ঘটনা ঘটেছিল ১৫শ শতকের শেষে ও ১৬শ শতকের শুরুতে যখন ভূমধ্যসাগরের পশ্চিম প্রান্তে আন্দালুসিয়া (মুসলিম স্পেন) তার স্বাধীনতা হারায় আর পূর্ব প্রান্তে ওসমানীরা হয়ে উঠছে প্রাচ্যের মুখ্য শক্তি

Sultan Bayezid II

ওসমানী সুলতান দ্বিতীয় বায়েজিদ তাঁর গোটা নৌবাহিনীকে স্পেনে পাঠান ইহুদিদেরকে উদ্ধার করে ইস্তানবুলে নিয়ে আসার জন্য যাতে স্পেনে তাদের জন্য যে গণহত্যা অপেক্ষা করছিল তা তারা এড়াতে পারে

১৪৯২ খ্রিস্টাব্দে আইবেরিয়া (বর্তমান স্পেন ও পর্তুগাল) এর সর্বশেষ মুসলিম রাষ্ট্র- ‘গ্রানাদা আমিরাত’ এর পতন ঘটে খ্রিস্টান ক্যাস্টিলে ও অ্যারাগন প্রদেশের সম্মিলিত বাহিনীর কাছে। ক্যাস্টিলে ও অ্যারাগন প্রদেশ একত্রিত হয়ে পরবর্তীতে স্পেন গঠন করে। আইবেরিয়াতে থেকে যাওয়া মুসলিম অধিবাসীরা “মরিস্কো” নামে পরিচিত ছিল। গ্রানাদা আমিরাত দখলের পর গ্রানাদার মুসলিম অধিবাসীদেরকে ক্যাথোলিক সম্রাটরা ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দেন।

তবে ১৫০২ খ্রিস্টাব্দে এক রাজকীয় ফরমানের মাধ্যমে ক্যাথোলিক খ্রিস্টান ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয় এবং সকলের উপর এই ধর্ম জোরপূর্বক চাপিয়ে দেয়া হয়। আর মুসলিমদের জন্য বিধান হয় যে, তাদেরকে সর্বসমক্ষে ক্যাথোলিকে ধর্মান্তরিত হওয়ার ঘোষণা দিতে হবে, নাহলে বরণ করে নিতে হবে কঠোর শাস্তি।

ধর্মীয় নিপীড়ন-নির্যাতনের এই কঠিন দুর্যোগপূর্ণ পরিবেশে ১৫০২ খ্রিস্টাব্দে আন্দালুসিয়া (মুসলিম স্পেন) এর এক অজ্ঞাতনামা কবি ওসমানী সুলতান দ্বিতীয় বায়েজিদ (শাসনকালঃ ১৪৮১-১৫১২ খ্রিস্টাব্দ) এর কাছে সাহায্যের আবেদন করে একটি কবিতা রচনা করেন। তাঁর আবেদনপত্রটির অংশবিশেষ নিম্নে তুলে ধরা হলোঃ বিস্তারিত পড়ুন

Posted in আল-আন্দালুস (মুসলিম স্পেন), ওসমানী ইতিহাস | Tagged , , , , | ১ টি মন্তব্য

স্পেনের বিস্মৃত মুসলিমরা – মরিস্কোদের উচ্ছেদ

ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে বিষাদময় ঘটনাগুলোর একটি হলো আল-আন্দালুস বা মুসলিম স্পেনের পতন। শত শত বছর ধরে আইবেরিয়া উপদ্বীপ ছিল মুসলিম অধ্যুষিত ও মুসলিম শাসনাধীন এক মুসলিম ভূমি। আল-আন্দালুসের স্বর্ণযুগে এর মুসলিম জনসংখ্যা ছিল ৫০ লক্ষেরও বেশী এবং তারাই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। মুসলিম শাসকরা (ইসলামী) বিশ্বাস ও জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে সেখানে তৈরী করেছিলেন এক উন্নত ও অগ্রগামী সভ্যতা। ১০ম শতকে আল-আন্দালুসের রাজধানী কর্ডোবায় ছিল শান বাঁধানো রাস্তাঘাট, হাসপাতাল এবং শহরজুড়ে রাস্তাঘাটে ছিল বাতির ব্যবস্থা। এসময় খ্রিস্টান ইউরোপের সর্ববৃহৎ লাইব্রেরীতে বই ছিল যেখানে মাত্র ৬০০ টি, সেখানে কর্ডোবার ক্যালিগ্রাফারগণ বছরে ৬০০০ টি বই তৈরী করতেন। ইউরোপ ও আফ্রিকার সংস্কৃতির মিশ্রণে শান্তিপূর্ণ এক সমাজ গড়ে উঠেছিল আল-আন্দালুসে, যেখানে শান্তিময় সহাবস্থান ছিল মুসলিম, ইহুদি এবং খ্রিস্টান জনগোষ্ঠীর।

প্রায় স্বপ্নসম সেই সমাজ আজীবন টেকেনি। কারণ স্পেনের ক্যাথোলিক রাজাদের পরিচালিত তথাকথিত “রিকনকুইস্তা” বা পুনর্দখল আন্দোলনের ব্যপ্তি ঘটতে থাকে ১১শ থেকে ১৫শ শতাব্দী পর্যন্ত। ফলে স্পেনের মুসলিমরা একঘরে হয়ে পড়ে। ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দে যখন আইবেরিয়ার সর্বশেষ মুসলিম রাজ্য- গ্রানাদার পতন হয় তখন স্পেনের মুসলিমরা এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়, যা ছিল — গণহত্যা।

[রিকনকুইস্তা (Reconquista) হচ্ছে একটি স্পেনীয় ও পর্তুগীজ শব্দ যার ইংরেজি হচ্ছে Reconquest (অর্থঃ পুনর্দখল)। ঐতিহাসিকরা ৭১৮ বা ৭২২ থেকে ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় ৭৭০ বছরের সময়কালকে “রিকনকুইস্তা” হিসেবে অভিহিত করে থাকেন, যা মূলত খ্রিস্টানদের স্পেন পুনর্বিজয়ের আন্দোলনকে বুঝানো হয়।]

দখল

১৪৯২ খ্রিস্টাব্দে গ্রানাদার পতনের পর বেশীরভাগ মুসলিমই এই পরিস্থিতিকে সাময়িক এবং সামান্য বাধা-বিপত্তি হিসেবে ধরে নিয়েছিল। তারা ভেবেছিল আফ্রিকা থেকে শীঘ্রই মুসলিম বাহিনী এসে গ্রানাদা পুনর্বিজয় করবে এবং একটি মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে মুসলিম শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে। যদিও নতুন স্পেনীয় শাসক — ফার্দিনান্দ এবং ইসাবেলার পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন কিছু।

Sultan Bayezid II

ওসমানী সুলতান দ্বিতীয় বায়েজিদ তাঁর গোটা নৌবাহিনীকে স্পেনে পাঠান ইহুদিদেরকে উদ্ধার করে ইস্তানবুলে নিয়ে আসার জন্য যাতে স্পেনে তাদের জন্য যে গণহত্যা অপেক্ষা করছিল তা তারা এড়াতে পারে

প্রথমেই ধর্মীয় ব্যাপারে তারা তাদের লক্ষ্য পরিষ্কারভাবে নির্ধারণ করে। ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে স্পেনের শাসকরা এক ফরমান জারী করে যার মাধ্যমে কার্যকরভাবে স্পেনের সকল ইহুদিদেরকে স্পেন থেকে বিতারণ করতে সক্ষম হয়। শত শত হাজার হাজার ইহুদিকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হয় যাদের বেশিরভাগই ওসমানী সাম্রাজ্যে চলে যায়। ওসমানী সুলতান দ্বিতীয় বায়েজিদ তাঁর গোটা নৌবাহিনীকে স্পেনে পাঠান ইহুদিদেরকে উদ্ধার করে ইস্তানবুলে নিয়ে আসার জন্য যাতে স্পেনে তাদের জন্য যে গণহত্যা অপেক্ষা করছিল তা তারা এড়াতে পারে।

মুসলিমদের ব্যাপারে স্প্যানিশদের নীতিও খুব একটা ভিন্ন ছিলনা। ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দে গোটা স্পেনজুড়ে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫ লক্ষের মতো। তাদের উপর থেকে মুসলিম রাষ্ট্রের নিরপত্তার ছায়া সরে যাওয়ার পর ক্যাথোলিক চার্চ সকল মুসলিমকে খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করার ব্যাপারটা গুরুত্বসহকারে নেয়।

প্রাথমিকভাবে ঘুষপ্রদানের মাধ্যমে মুসলিমদেরকে খ্রিস্টান করার চেষ্টা করা হয়। সকল ধর্মান্তরিত ব্যক্তিকে উপহার, টাকা-পয়সা এবং জমি দেয়া হতো। তবে বেশিরভাগই উপহার পাওয়ার পর বিস্তারিত পড়ুন

Posted in আল-আন্দালুস (মুসলিম স্পেন) | Tagged , , , , , | ১ টি মন্তব্য

সুলতান সুলেয়মান আল-কানুনি’র শাসনামল

১৪শ শতকের শুরুর দিকে যখন উল্কার গতিতে ওসমানীদের উত্থান শুরু হয়েছিল তখন তাঁরা ছিল মুসলিম বিশ্বের এক প্রান্তে ছোট একদল যোদ্ধা। ওসমান গাজীর অধীনে সাদামাটা নিরহঙ্কার এক সূচনা হয়েছিল ওসমানী সাম্রাজ্যের, আর বিস্তৃতি লাভ করেছিল ইউরোপ ও এশিয়ার সীমান্তলগ্ন অঞ্চলজুড়ে। ওসমান গাজীর নামেই সাম্রাজ্যের নাম হয় ওসমানী সাম্রাজ্য। সাবেক বাইজেন্টাইন রোমান সাম্রাজ্য এবং সেলজুক তুর্কি সাম্রাজ্যের অধীনস্ত অঞ্চলগুলোতে ওসমানীরা স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনে, আর এর মাধ্যমে খ্রিস্টান এবং মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে তাদের নিয়ন্ত্রণে প্রতিষ্ঠা করে। সুলতান প্রথম বায়েজিদ (বায়েজিদ য়িলদিরিম, শাসনকালঃ ১৩৮৯-১৪০৩), দ্বিতীয় মুহাম্মাদ (ফাতিহ্‌ সুলতান মুহাম্মাদ, শাঃ ১৪৫১-১৪৮১), প্রথম সেলিম (ইয়াভুজ সুলতান সেলিম, শাঃ ১৫১২-১৫২০) এর অধীনে ওসমানী সাম্রাজ্য বিস্তার লাভ করে এবং হয়ে উঠে বিশ্বের অন্যতম এক পরাশক্তি।

ওসমানীরা তাদের সাফল্যের শিখরে পৌঁছায় সুলতান সুলেয়মান এর সময়ে। তাঁর শাসনামলে (১৫২০-১৫৬৬ খ্রিস্টাব্দ) ওসমানীরা স্পষ্টতই ইউরোপে ও মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী শক্তি ছিল। তাঁর শাসনামলকে দেখা হয় ওসমানী ও ইসলামী ইতিহাসের স্বর্ণযুগ হিসেবে। এমনকি অমুসলিমরাও ওসমানী সাম্রাজ্যের গৌরবকে স্বীকার করে সুলতান সুলেয়মানকে “the Magnificent” (মহৎ) উপাধি দিয়েছে। অন্যদিকে মুসলিমদের মাঝে তিনি পরিচিত ছিলেন “কানুনি” (the Lawgiver – আইনপ্রণেতা) হিসেবে। যদিও তাঁর পরে ধীরে ধীরে ওসমানী সাম্রাজ্যের পতন শুরু হয়, তবে ১৬শ শতকে ওসমানী সাম্রাজ্যের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি এতোই ছিল যে এর ইতি ঘটে আরো ৩০০ বছর পরে — ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে

প্রারম্ভিক শাসনামল এবং বিজয়সমূহ

ottomanempirein1683-1024x963

সুলতান সুলেয়মান আল-কানুনির শাসনামলে ওসমানী সাম্রাজ্যের মানচিত্র

সুলতান সুলায়মানের পিতা- সুলতান প্রথম সেলিম (ইয়াভুজ সুলতান সেলিম) ওসমানী সাম্রাজ্যের ভূরাজনৈতিক সীমান্তের ব্যাপক পরিবর্তন আনেন। তাঁর নেতৃত্বে ১৫১০-এর দশকে ওসমানীদের শাসনাধীন অঞ্চল বৃদ্ধি পায়, এর মধ্যে ছিল আরব বিশ্ব, উত্তর আফ্রিকার পশ্চিমাঞ্চল থেকে পূর্বে পারস্য সীমান্তে আরব উপদ্বীপ পর্যন্ত।

নতুন নতুন অঞ্চল বিজয়ের সাথে সাথে মুসলিম বিশ্বের ‘খলিফা’ খেতাবটিও ওসমানীদের করায়ত্ত হয়। ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দে মঙ্গোল কতৃক বাগদাদ ধ্বংসযজ্ঞের পর আব্বাসীয় খলিফারা কায়রোতে মামলুক সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতায় বসবাস করতে থাকে। যদিও তখন খলিফা পদটির আর কোন শক্তি ও ক্ষমতা ছিলনা, বরং ছিল এক প্রতীকী খেতাব মাত্র। সুলতান প্রথম সেলিমের অধীনে খিলাফত পুনরায় এর প্রকৃত তাৎপর্য এবং রাজনৈতিক শক্তি ফিরে পায়, লাভ করে এক পুনর্জীবন।

সুলতান সুলেয়মান এই ইসলামী সাম্রাজ্যের সিংহাসনে আসীন হন ১৫২০ খ্রিস্টাব্দে, মাত্র ২৬ বছর বয়সে। ওসমানী সুলতান এবং মুসলিম বিশ্বের খলিফা হিসেবে তাঁর প্রথম কাজ ছিল ওসমানী সাম্রাজ্যকে কুরে কুরে খাওয়া নানামুখী হুমকির মূলোৎপাটন করা। এই কাজ সম্পন্ন করতে পারলেই ওসমানী সাম্রাজ্যের শক্তি ও অধিপত্তি সকলের কাছে স্বীকৃত হবে এবং কেউই একজন নতুন এবং তরুণ সুলতানের থেকে সুবিধা আদায়ের কথা চিন্তাও করতে পারবেনা। বিস্তারিত পড়ুন

Posted in ওসমানী ইতিহাস, নির্বাচিত | Tagged , , , , , , , | 3 টি মন্তব্য

গ্রানাদা — স্পেনের সর্বশেষ মুসলিম সাম্রাজ্য

৭১১ খ্রিস্টাব্দে আইবেরিয়া উপদ্বীপে (বর্তমান স্পেন ও পর্তুগাল) ইসলাম পৌঁছায়। সেখানকার রাজা রডারিক এর অত্যাচারী শাসনের ইতি ঘটাতে আইবেরিয়ার নির্যাতিত-নিপীড়িত খ্রিস্টানদের থেকে আমন্ত্রণ পাওয়া মুসলিম বাহিনী তারিক বিন জিয়াদের নেতৃত্বে মরক্কো ও স্পেনের মধ্যবর্তী জিব্রাল্টার প্রণালী অতিক্রম করে। এরপর সাত বছরের মধ্যেই আইবেরিয়া উপদ্বীপের বেশিরভাগ অঞ্চলই মুসলিম নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। আর এই অঞ্চলের বিভিন্ন অংশ পরবর্তী ৭০০ বছর ধরে মুসলিম নিয়ন্ত্রণেই থাকে।

১০ম শতকের মাঝামাঝিতে আল-আন্দালুসের ইসলাম স্বর্ণযুগে পৌঁছায়। প্রায় ৫০ লক্ষ মুসলিমের আবাসস্থল হয় আল-আন্দালুস, যা সেখানকার মোট জনসংখ্যার ৮০% এরও বেশী। এক শক্তিশালী, সমৃদ্ধ এবং ঐক্যবদ্ধ উমাইয়া খিলাফত এই অঞ্চল শাসন করছিল। আর আল-আন্দালুস (বা আন্দালুসিয়া) হয়ে উঠেছিল ইউরোপের সবচেয়ে অগ্রগামী এবং স্থিতিশীল অঞ্চল। আল-আন্দালুসের রাজধানী কর্ডোবা আকর্ষণ করছিল গোটা মুসলিম বিশ্বের এবং ইউরোপের জ্ঞানপিপাসুদের। যাই হোক, এই স্বর্ণযুগ আজীবন স্থায়ী ছিলনা। ১১শ শতকের দিকে খিলাফত ভেঙ্গে যায় এবং অসংখ্য ছোট ছোট রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে যেগুলোকে বলা হতো ‘তাইফা’। মুসলিম তাইফাগুলো বিভক্ত ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, সাথে সাথে আল-আন্দালুসের উত্তর দিকের খ্রিস্টান রাজ্যগুলো থেকে আক্রমণের আশঙ্কা বেড়ে যায়। পরবর্তী ২০০ বছরে তাইফাগুলো এক এক করে খ্রিস্টান “রিকনকুইস্তা”-র কাছে ধরাশায়ী হতে থাকে। ১২৪০-এর দশকে এসে আল-আন্দালুসের একমাত্র মুসলিম তাইফা বাকি থাকে, সেটা হচ্ছে গ্রানাদা। এই প্রবন্ধে আমরা আইবেরিয়া উপদ্বীপের এই শেষ মুসলিম রাজ্যের পতনের উপর আলোকপাত করব।

[রিকনকুইস্তা (Reconquista) হচ্ছে একটি স্পেনীয় ও পর্তুগীজ শব্দ যার ইংরেজি হচ্ছে Reconquest (অর্থঃ পুনর্দখল)। ঐতিহাসিকরা ৭১৮ বা ৭২২ থেকে ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় ৭৭০ বছরের সময়কালকে “রিকনকুইস্তা” হিসেবে অভিহিত করে থাকেন, যা মূলত খ্রিস্টানদের স্পেন পুনর্বিজয়ের আন্দোলনকে বুঝানো হয়।]

গ্রানাদা আমিরাত
রিকনকুইস্তার সময় আল-আন্দালুসের উত্তরদিক থেকে আসা হানাদার খ্রিস্টান রাজ্যগুলোর হাতে একের পর এক মুসলিম রাজ্যগুলোর পতন হতে থাকে। কর্ডোবা, সেভিয়া এবং টলেডোর মতো বড় বড় শহরগুলোর পতন হয় ১১শ থেকে ১৩শ শতকের মধ্যে। যদিও উত্তর আফ্রিকার মুরাবিতুন এবং মুওয়াহিদুন আন্দোলনগুলো খ্রিস্টানদের আক্রমণের এই স্রোতকে মন্থর করতে সাহায্য করেছিল, তবে মুসলিমদের মাঝে চরম অনৈক্য শেষ পর্যন্ত তাদের রাজ্যহীন ও ভূমিহীনে পরিণত হওয়ার দিকেই ধাবিত করে।

nasrid_dynasty_kingdom_of_grenade_1013-1492-svg_

গ্রানাদা আমিরাতের সীলমোহর, যাতে লেখা রয়েছে “আল্লাহ ছাড়া কোন বিজয়ী নেই”

একটিমাত্র মুসলিম প্রদেশ — গ্রানাদা – ১৩শ শতকে খ্রিস্টানদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছিল। ১২৩৬ খ্রিস্টাব্দে কর্ডোবার পতনের পর গ্রানাদা আমিরাতের শাসকগণ শক্তিশালী খ্রিস্টান ক্যাস্টিলে সাম্রাজ্যের সাথে এক বিশেষ চুক্তি স্বাক্ষর করে। অর্থাৎ তারা “গ্রানাদা আমিরাত” হিসেবে স্বাধীন থাকার অনুমতি পেয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ক্যাস্টিলে সাম্রাজ্যের আক্রমণের মুখোমুখি হওয়ার পরিবর্তে তাদেরকে চড়া মূল্যে ক্যাস্টিলে সাম্রাজ্যের কাছে কর প্রদান করতে হয়েছিল। এই কর প্রদান করতে হতো প্রতি বছর স্বর্ণমুদ্রা হিসেবে। এটি গ্রানাদার মুসলিমদের আরো দুর্যোগপূর্ণ অবস্থায় ফেলে দেয় যেহেতু তারা নিজেরাই নিজেদের শত্রুদের কাছে কর প্রদানের মাধ্যমে শত্রুদের ধীরে ধীরে আরো শক্তিশালী করে তুলছিল।

এছাড়াও গ্রানাদা আমিরাতের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ থাকার পেছনে অন্যান্য আরো কারণগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে এর ভৌগলিক অবস্থান। গ্রানাদা দক্ষিণ স্পেনের সিয়েরা নেভাদা পর্বতমালার মধ্যে অনেক উঁচু স্থানে অবস্থিত যা আক্রমণকারী বহিঃশক্তির বিরুদ্ধে একটা প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করতো। একারণে খ্রিস্টান ক্যাস্টিলে সাম্রাজ্যের চেয়ে সামরিক শক্তির দিক দিয়ে দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও এই পর্বতমালা গ্রানাদাকে দিয়েছিল আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে বিশাল এক সুবিধা।

গ্রানাদার যুদ্ধ এবং অস্তিত্বের লড়াই
প্রায় ২৫০ বছরেরও বেশী সময় ধরে গ্রানাদা টিকে ছিল শক্তিশালী খ্রিস্টান ক্যাস্টিলে সাম্রাজ্যকে কর প্রদান করে যাওয়ার মাধ্যমে। শত্রুভাবাপন্ন খ্রিস্টান রাজ্যবেষ্টিত হওয়ায় গ্রানাদা প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে ছিল। ১৫শ শতকের শুরুর দিকে আল-আন্দালুসের সর্বশেষ এই রাজ্য নিয়ে এক মুসলিম স্কলার লিখেছিলেনঃ বিস্তারিত পড়ুন

Posted in আল-আন্দালুস (মুসলিম স্পেন), নির্বাচিত | Tagged , , | 3 টি মন্তব্য

সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ এবং রাসূল ﷺ এর প্রতিশ্রুতি

fatih-sultan-mehmed-ii-became-sultan-of-the-ottoman-empire

ফাতিহ্‌ সুলতান মুহাম্মাদ

রাসূল মুহাম্মদ ﷺ আরব মরুভূমিতে তাঁর অনুসারীদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে একদিন তারা তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর এবং কিংবদন্তি নগরী কনস্ট্যান্টিনোপোল (বাইজেন্টাইন [পূর্ব রোমান] সাম্রাজ্যের রাজধানী) জয় করবে। তবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি মুসলিমদের জন্য অধরাই থেকে গিয়েছিল। কনস্ট্যান্টিনোপোল (বর্তমানে তুরস্কের রাজধানী “ইস্তানবুল”) বিজয় মনে হচ্ছিল যেন এক অসম্ভব কাজ। শহরটি ছিল খুবই সুরক্ষিত। উপদ্বীপ হওয়াতে একদিকে বসফরাস প্রণালী দ্বারা জলবেষ্টিত এবং অন্য দিক দিয়ে সুবিশাল দেয়াল শহরটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে করে তুলেছিল অপ্রতিরোধ্য, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কনস্ট্যান্টিনোপোল বিজয়ের স্বপ্নে বিভোর সকল বিজেতাদেরকে নিরস্ত ও নিবৃত্ত করে এসেছিল। উমাইয়া খিলাফতের সময় মুসলিম সেনাবাহিনী কনস্ট্যান্টিনোপোল অবরোধ করেছিল, তবে সেই অবরোধগুলো শহরটির অতিকায় দেয়ালগুলোকে ঘায়েল করতে পারেনি।

১৪শ শতকের শুরুর দিকে পশ্চিম আনাতোলিয়ার এক ছোট বেইলিক হিসেবে ওসমানী সাম্রাজ্যের উত্থান হওয়ার পর এটি বাইজেন্টাইন (পূর্ব রোমান) সাম্রাজ্য এবং এর রাজধানী কনস্ট্যান্টিনোপোলের নিরাপত্তার হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। ১৪৫১ খ্রিস্টাব্দে সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ সিংহাসনে আরোহণের সময়ে ওসমানীরা ইতিমধ্যে কনস্ট্যান্টিনোপোলের চারদিকে ইউরোপ ও এশিয়া উভয় মহাদেশের ভূখণ্ডেই নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে নিয়েছে। সুলতান হওয়ার মুহূর্তেই সুলতান মুহাম্মাদ এই কিংবদন্তি নগরী বিজয়কে নিজের লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি বসফরাস প্রণালীতে কনস্ট্যান্টিনোপোলের উত্তরদিকে একটি দুর্গ নির্মাণের উদ্যোগ নেন যাতে শহরটিতে আসা-যাওয়া করা জাহাজগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয়া যায়। রাসূল মুহাম্মাদ ﷺ ঘোষণা দিয়েছিলেন যে মুসলিমরা একদিন কনস্ট্যান্টিনোপোল বিজয় করবে। তাই রাসূল ﷺ এর সম্মানে সুলতান মুহাম্মাদ এমনভাবে দুর্গটি নির্মাণ করেছিলেন যেন উপর থেকে দেখলে দুর্গটিকে আরবী “মুহাম্মাদ” (محمد) বানান এর মতো দেখা যায়।

img_9339-1-800-533-vb

বর্তমানে ইস্তানবুল

১ এপ্রিল, ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দ। সুলতান মুহাম্মাদ এবং তাঁর এক লক্ষাধিক সৈন্যবিশিষ্ট ওসমানী সেনাবাহিনী কনস্ট্যান্টিনোপোল নগরীর প্রাচীরের সামনে এসে পৌঁছায়। তাঁরা সেখানে গিয়ে যে দৃশ্য দেখেছিলেন তা নিশ্চয়ই আতঙ্কজনক ছিল। কনস্ট্যান্টিনোপোলের প্রাচীরের ভেতরের অংশের দেয়াল ছিল ৫ মিটার পুরু এবং ১২ মিটার উঁচু। ভেতরের দেয়াল থেকে ২০ মিটার দূরে ছিল বাহিরের দেয়াল, যেটা ২ মিটার পুরু এবং ৮.৫ মিটার উঁচু। এই দেয়ালগুলো ইতিহাসে কোনদিনই বিজিত হয়নি। ইতিপূর্বে ওসমানীদের অনেকগুলো অবরোধ পরাস্ত হয়েছিল বারবার, এবং ৭ম শতকে মুয়াবিয়া (রাঃ) এর আমলেও উমাইয়াদের অবরোধ ব্যর্থ হয়েছিল।

দুর্ভেদ্য দেয়ালগুলোর পাশাপাশি শহরের “গোল্ডেন হর্ন” এ স্থাপন করা ছিল একটি অতিকায় লোহার শিকল। গোল্ডেন হর্ন হচ্ছে কনস্ট্যান্টিনোপোলের উত্তরদিকে অবস্থিত এক ছোট খাল। লোহার শিকলের মাধ্যমে গোল্ডেন হর্নে জাহাজ আগমন নিয়ন্ত্রণ করা যেত। যার ফলে বহিঃআক্রমণের বিরুদ্ধে তুলনামূলকভাবে কম সুরক্ষিত শহরের উত্তর উপকূলটিও যথেষ্ট নিরাপদ ছিল। এই শিকলের কারণে যেকোন নৌবাহিনীর আক্রমণ প্রতিরোধ করা যেত। যার ফলে যুদ্ধ শুরুর আগেই বাইজেন্টাইনরা পরিষ্কারভাবে প্রতিরক্ষার দিক দিয়ে অনেক বেশী সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। তাই ওসমানীদের তুলনায় লোকবলে ও অস্ত্রশস্ত্রে অনেক কম হওয়া সত্ত্বেও বাইজেন্টাইনরা সুনিশ্চিত ছিল তাদের “আসন্ন বিজয়” বিস্তারিত পড়ুন

Posted in ওসমানী ইতিহাস | Tagged , , , , | মন্তব্য দিন

একজন মুসলিম যিনি চীনের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ পরিব্রাজক ও নৌসেনাপতি — ঝেং হি

বিখ্যাত পর্যটকদের কথা চিন্তা করলে প্রথমেই আমাদের মনে ইবনে বতুতা, ইভলিয়া সেলেবি, মার্কো পোলো কিংবা ক্রিস্টোফার কলম্বাসের নাম চলে আসে। কিন্তু অনেকের কাছেই সর্বকালের সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং কৌতূহলোদ্দীপক পর্যটকের নামটি অজানা। চীনে তিনি বেশ সুপরিচিত, যদিও সেখানে তাঁকে সবসময় স্বীকৃতি দেয়া হয়না। তিনি হলেন ঝেং হি — একজন মুসলিম যিনি পরবর্তীতে চীনের সর্বশ্রেষ্ঠ নৌসেনাপতি (admiral), পরিব্রাজক এবং কুটনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেন।

জন্ম এবং শৈশব
ঝেং হি ১৩৭১ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ চীনের ইউনান অঞ্চলের এক হুই (একটি জাতিগতভাবে চীনা গোত্র যারা ইসলাম ধর্মের অনুসারী) পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মকালে তাঁর নাম দেয়া হয় “মা হে”। চীনে পারিবারিক নাম আগে বলা হয় এবং পরে ডাকনাম বলা হয়। চীনে “মা” হচ্ছে “মুহাম্মাদ” এর সংক্ষিপ্ত রূপ যা মূলত ঝেং হি’র পরিবারের মুসলিম পরিচয় ও ঐতিহ্যের নির্দেশক। তাঁর বাবা ও দাদা উভয়ই মক্কায় সফর করে হজ্জ পালন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এথেকে বোঝা যায় ঝেং হি এর জন্ম হয়েছিল এক ধর্মপ্রাণ মুসলিম পরিবারে।

ঝেং এর শৈশবকালে মিং সাম্রাজ্যের সৈন্যবাহিনী তাঁর শহর আক্রমণ করে। তাঁকে বন্দী করা হয় এবং রাজধানী নানজিং এ নিয়ে যাওয়া হয় যেখানে তিনি রাজপ্রাসাদে চাকর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নানা অত্যাচার ও কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে তাঁর জীবন অতিবাহিত হলেও যুবরাজ “ঝু ডি” এর সাথে তাঁর বন্ধুত্ব হয়ে যায়। আর পরবর্তীতে সেই যুবরাজ যখন সম্রাট হন, তিনি ঝেং হি কে সরকারী উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেন। এসময়েই তাকে সম্মানসূচক “ঝেং” পদবী দেয়া হয় এবং তিনি “ঝেং হি” হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেন।

নৌ অভিযানসমূহ
১৪০৫ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট “ঝু ডি” যখন বাকি দুনিয়া আবিষ্কার এবং বিভিন্ন অঞ্চলের সাথে বাণিজ্যসম্পর্ক স্থাপনের জন্য সুবিশাল জাহাজের বহর পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন, তিনি ঝেং হি কে এই অভিযানে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য মনোনীত করেন। অভিযানটি ছিল বিশাল। ঝেং হি এর নেতৃত্বে প্রত্যেকটা অভিযানে প্রায় ৩০,০০০ জন নাবিক অংশগ্রহণ করে। ১৪০৫ থেকে ১৪৩৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ঝেং মোট ৭ টি অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানগুলোয় তিনি হিন্দুস্তান, আধুনিক মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, শ্রীলংকা, ইরান, ওমান, ইয়েমেন, সৌদী আরব, সোমালিয়া, কেনিয়াসহ আরো অনেক দেশে নোঙ্গর ফেলেন। সম্ভবত এর মধ্যে কোন একটি সফরে ঝেং মক্কা ভ্রমণ করতে ও হজ্জ সম্পন্ন করতে সক্ষম হন।

zheng-he-7th-expedition-map

মানচিত্রে ১৫শ শতকে বিশ্বের বিভিন্ন মহাদেশে ঝেং হি’র ৭ টি অভিযানের যাত্রাপথ

এই অভিযানগুলোতে ঝেং হি একমাত্র মুসলিম ছিলেননা। তাঁর উপদেষ্টাদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন চীনা মুসলিম, যেমন “মা হুয়ান” নামক একজন অনুবাদক যিনি আরবী ভাষা জানতেন এবং তাদের অভিযানগুলোতে মুসলিম মানুষদের সাথে দেখা হলে তাদের সাথে কথাবার্তা বলতে পারতেন। তিনি একটি ভ্রমণকাহিনী লিখেছেন যার নাম “য়িং-য়াই শেং-ইয়ান”। যেটি ১৫শ শতকে ভারত মহাসাগরের চারদিকে বিভিন্ন সমাজের ব্যাপারে জানার জন্য একটি গুরত্বপূর্ণ বই।

যারা তাদের জীবদ্দশায় এই অভিযানগুলো দেখেছিল তাদের জন্য এগুলো নিশ্চয়ই শীঘ্রই ভুলে যাবার মতো ছিলনা। ঝেং হি যে জাহাজটির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সেটি ছিল ৪০০ ফিট লম্বা, কলম্বাসের আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেয়া জাহাজের চেয়েও বিস্তারিত পড়ুন

Posted in পূর্ব – এশিয়াতে ইসলাম | Tagged , , , , , , , , , , , , , , , | মন্তব্য দিন

কিভাবে অর্থ উপার্জন করা যায় — ইবনে খালদুন এবং করব্যবস্থা

আমেরিকার ৪০তম প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান ১৯৯৩ সালে নিউইয়র্ক টাইমসে দেয়া তার এক বিখ্যাত সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন,

“আমি কি তোমাদের সামনে ১৪শ শতকের আরব ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুনের উপদেশটা পেশ করতে পারি? যিনি বলেছিলেন, “শুরুর দিকে একটা সাম্রাজ্যের করের হার কম থাকে কিন্তু রাজস্ব আয়ের পরিমাণ থাকে বেশি। অন্যদিকে সাম্রাজ্যের পতনকালে করের হার বেশি থাকে কিন্তু রাজস্ব আয়ের পরিমাণ থাকে কম।”

আর, না, ব্যক্তিগতভাবে খালদুনের সাথে আমার পরিচয় নেই। তবে আমাদের নিজেদের পরিচিত কিছু বন্ধুবান্ধব থাকতে পারে।” (১)

 

reagan

প্রেসিডেন্ট রিগ্যান ১৯৮১ সালে টেলিভিশনে তার কর হ্রাসকরণ পরিকল্পনা তুলে ধরছেন। ইবনে খালদুন এবং সরবারহ-ভিত্তিক অর্থনীতির ধারণা রিগ্যানকে অনেক প্রভাবিত করেছিল।

রোনাল্ড রিগ্যানের এই রক্ষণশীল অর্থনৈতিক নীতির সাথে কেউ একমত বা দ্বিমত হতে পারেন, কিন্তু রিগ্যান ইবনে খালদুন নামে যে ব্যক্তি থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন তাঁর মেধা, যোগ্যতা ও বিদগ্ধতা নিয়ে কারো কোন প্রশ্ন নেই। তিনি ছিলেন তাঁর সময়েরও অনেক অগ্রগামী চিন্তক। ১৩৭৭ খ্রিস্টাব্দে তাঁর অমর কীর্তি ‘মুকাদ্দিমাহ্‌’ (আরবীঃ مقدّمة ابن خلدون‎‎) প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থটিকে বই হিসেবে সুনির্দিষ্ট কোনো শ্রেণীতে ফেলা বেশ কঠিন। একইসাথে বইটিতে ইতিহাস, ইসলাম, বিজ্ঞান, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, রাজনীতি, যু্দ্ধবিদ্যা এবং দর্শনের উপর তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা রয়েছে। শুধু একটি প্রবন্ধে তাঁর বইটির বর্ণনা শেষ করা হলে ইবনে খালদুন এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তাঁর রেখে যাওয়া বিশাল জ্ঞানভাণ্ডারের প্রতি অবিচার করা হবে। বরং এই আলোচনায় আমরা তাঁর কিছু অর্থনৈতিক ধারণার উপর দৃষ্টিপাত করব, যা কয়েক শতাব্দী পরে গঠিত সরকারগুলোর কর ব্যবস্হাপনার মূল ভিত্তি হিসেবে বর্তমানে কাজ করছে।

ইবনে খালদুনের পরিচয়
তিনি উত্তর আফ্রিকার তিউনিস নগরীতে এক ধনী আন্দালুসি (মুসলিম স্পেনীয়) পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। আইবেরিয় উপদ্বীপ (বর্তমান স্পেন ও পর্তুগাল) এর কর্তৃত্ব মুসলিমদের হাত থেকে খ্রিস্টানদের হাতে চলে গেলে তাঁর পরিবারকে এ অঞ্চল থেকে পালিয়ে তিউনিসে চলে আসতে হয়। ছোটকাল থেকেই তিনি বিভিন্ন ধর্মীয় বিষয় তথা কুরআন, হাদিস, ফিক্‌হ, আইন এবং বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় যেমন পদার্থবিদ্যা, গণিত, যুক্তিবিদ্যা, দর্শন প্রভৃতি বিষয়ে জ্ঞানার্জন করেন। জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় এই বুৎপত্তি অর্জন তাঁকে পরবর্তী জীবনে বিশ্ব সম্পর্কে উপলব্ধি এবং সে সম্পর্কিত বিশ্লেষণকে প্রভাবিত করে।

ibn-khaldun

তিউনিসিয়ার রাজধানী তিউনিসে ইবনে খালদুনের ভাস্কর্য

পরিণত জীবনের শুরুর দিকে তিনি উত্তর আফ্রিকাজুড়ে বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট কেরানীর কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৩৬৪ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন আল-আন্দালুস (মুসলিম স্পেন) এর গ্রানাদা আমিরাতে একটি কাজের সুযোগ পেলে তিনি তা লুফে নেন। তিনি সেখানে গ্রানাদা সরকারের পক্ষে একজন সফল কুটনীতিক হিসেবে কাজ করেন এবং গ্রানাদা সরকারের সঙ্গে পাশ্ববর্তী খ্রিস্টান রাজ্যগুলোর শান্তিচুক্তি প্রণয়নে অবদান রাখেন। পরে অবশ্য রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের কারণে তিনি পদত্যাগ করেন এবং আফ্রিকায় ফিরে আসেন। এরপর এখানেই তিনি ‘মুকাদ্দিমাহ্‌’ সংকলনের কাজ সম্পন্ন করেন।

রাজস্ব আয়
বলা হয়ে থাকে, অর্থনীতির উপর ইবনে খালদুনের আলোচনাগুলোর সাথে সবসময় সরকার এবং সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের সংশ্লিষ্টতা থাকত। তিনি দাবী করেন যে, যেকোন রাজবংশ কিংবা সাম্রাজ্যের একটি প্রাকৃতিক সময়সীমা আছে। প্রায় কখনোই তা তিন প্রজন্মের বেশি স্থায়ী হয়না এবং এই পর্যায়ে এসে নতুন কোন রাজবংশ আগেরটার জায়গা দখল করে নেয়। করব্যবস্থা এই সময়সীমার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত এবং একটি রাজবংশ বা সরকার কতদিন স্থায়ী হবে করব্যবস্থাই তা নির্ধারণ করতে সহায়তা করে।

রোনাল্ড রিগ্যানের উদ্ধৃত “আরোপিত কর যখন কম থাকে তখন রাজস্ব আয়ের পরিমাণ বেশি থাকে এবং করের হার বেশি থাকার অর্থ রাজস্ব আয়ের পরিমাণ কম” মন্তব্যটি ইবনে খালদুন তাঁর রাজস্ব আয় সংক্রান্ত আলোচনার শুরুতে বিস্তারিত পড়ুন

Posted in দর্শন | Tagged , , , , | 3 টি মন্তব্য